খুঁজুন
                               
বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৯ বৈশাখ, ১৪৩৩

সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সহযোগী না কি সৃজনশীলতার নীরব সংকট?

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ
সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সহযোগী না কি সৃজনশীলতার নীরব সংকট?

ডিজিটাল বিপ্লবের এই সময়ে সাংবাদিকতা এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।  তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ধারায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এখন শুধু প্রযুক্তি জগতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গণমাধ্যমের অঙ্গনেও শক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে।  সংবাদ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, এমনকি প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।  অনেক ক্ষেত্রে এটি কাজকে সহজ, দ্রুত এবং তথ্যনির্ভর করে তুলছে—কিন্তু একইসঙ্গে উঠছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতার সৃজনশীলতাকে সহায়তা করছে, নাকি ধীরে ধীরে তা ক্ষয় করে দিচ্ছে?
বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক সাংবাদিক সরাসরি এআই ব্যবহার করে সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করছেন।  এটি নিঃসন্দেহে সময় সাশ্রয়ী এবং তাৎক্ষণিক ফলপ্রসূ মনে হতে পারে।  কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকিও কম নয়।  যখন একজন সাংবাদিক নিজে চিন্তা না করে, বিশ্লেষণ না করে একটি যন্ত্রের ওপর নির্ভর করেন তখন তার পেশাগত দক্ষতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে।  লেখার মৌলিক গঠন, ভাষার শৈলী, তথ্যের ব্যাখ্যা—সবকিছুতেই একধরনের যান্ত্রিকতা প্রবেশ করে।  ফলে সাংবাদিকতার প্রাণ, অর্থাৎ মানবিক অনুভূতি ও গভীরতা, ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয় এটি মানুষের গল্প বলার একটি শক্তিশালী শিল্প।  একটি প্রতিবেদন তখনই প্রভাব ফেলে, যখন সেখানে থাকে মানবিক স্পর্শ, বাস্তব অভিজ্ঞতার গভীরতা এবং লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি।  এআই হয়তো দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কান্না, দুর্যোগে বেঁচে থাকার সংগ্রাম কিংবা সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ—এই অনুভূতিগুলো একটি যন্ত্র কখনোই সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না।  ফলে এআই-নির্ভর প্রতিবেদনগুলো অনেক সময় তথ্যসমৃদ্ধ হলেও প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।  একজন সাংবাদিক যখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকেন, তখন তিনি শুধু আগুনের ক্ষয়-ক্ষতি নয়, মানুষের আতঙ্ক, অসহায়ত্ব এবং বেঁচে থাকার আকুতি প্রত্যক্ষ করেন।  সেই অভিজ্ঞতা তার লেখায় প্রতিফলিত হয়, যা পাঠকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।  কিন্তু যদি একই প্রতিবেদন শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক এআই দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে সেখানে সংখ্যার হিসাব থাকলেও মানবিক আবেগের ঘাটতি থেকেই যাবে।  এটাই সাংবাদিকতা ও যান্ত্রিক লেখার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।
তবে এআই-কে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।  বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি সাংবাদিকতার জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। গবেষণামূলক কাজে, তথ্য যাচাইয়ে, ডেটা বিশ্লেষণে কিংবা নতুন ধারণা খুঁজে পেতে এআই হতে পারে এক অসাধারণ সহায়ক।  উদাহরণস্বরূপ, কোনো জটিল আইনগত বিষয়ের ওপর রিপোর্ট করতে গেলে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা, পূর্ববর্তী নজির বা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত খুঁজে বের করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  এতে সময় বাঁচে এবং প্রতিবেদনের তথ্যভিত্তিক শক্তি বাড়ে।
কিন্তু এখানেই একটি সীমারেখা টানা জরুরি।  তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে এআই সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যকে ব্যাখ্যা করা প্রেক্ষাপট তৈরি করা এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করার দায়িত্ব একজন সাংবাদিকেরই।  এই ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারলে সাংবাদিকতা তার মৌলিক চরিত্র হারাবে।
বর্তমান সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিউম্যান টাচ বা মানবিক স্পর্শ।  পাঠক বা দর্শক শুধুমাত্র তথ্য জানতে চায় না; তারা চায় সেই তথ্যের পেছনের গল্প জানতে, অনুভব করতে।  একটি ভালো প্রতিবেদনে লেখকের চিন্তা, অনুভূতি এবং পর্যবেক্ষণের ছাপ থাকে।  এআই-নির্ভর লেখায় এই উপাদানগুলো অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।  ফলে তা পাঠকের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়।
এছাড়া অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা সাংবাদিকদের মধ্যে অলসতা তৈরি করতে পারে।  যখন সহজেই একটি লেখা তৈরি হয়ে যায়, তখন নিজের মেধা ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।  দীর্ঘমেয়াদে এটি পেশাগত দক্ষতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।  একজন সাংবাদিকের শক্তি তার অনুসন্ধানী মনোভাব, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভাষার ওপর দক্ষতা।  এই দক্ষতাগুলো চর্চার মাধ্যমে উন্নত হয়—কিন্তু এআই-এর ওপর নির্ভরতা বাড়লে এই চর্চা কমে যেতে পারে।
সাংবাদিকতার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য পড়ার অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  ভালো মানের পত্রিকা, বই, গবেষণাপত্র এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিবেদন পড়লে একজন সাংবাদিক তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে পারেন।  ভাষার বৈচিত্র্য, উপস্থাপনার কৌশল এবং তথ্য বিশ্লেষণের ধরন সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।  এই অভ্যাস একজন সাংবাদিককে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে, যা কোনো প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
এছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সাংবাদিকতার জন্য অপরিহার্য।  বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাদের অভিজ্ঞতা শোনা—এই প্রক্রিয়াগুলো একজন সাংবাদিককে সমৃদ্ধ করে। এআই এই অভিজ্ঞতা দিতে পারে না। এটি কেবল তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা উপলব্ধি করার ক্ষমতা তার নেই।
তবে এটিও সত্য যে আধুনিক সাংবাদিকতা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে।  দ্রুত সংবাদ পরিবেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতিযোগিতা, দর্শকের পরিবর্তিত চাহিদা—এসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।  তাই এআই-কে পুরোপুরি বর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়।  বরং প্রয়োজন এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা হতে পারে—এআই-কে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা।  এটি তথ্য সংগ্রহ, ধারণা তৈরি এবং প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে পারে।  এরপর সেই খসড়াকে একজন সাংবাদিক নিজের অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ এবং ভাষার দক্ষতা দিয়ে সমৃদ্ধ করবেন। এতে সময়ও বাঁচবে, আবার সৃজনশীলতাও বজায় থাকবে।
এছাড়া গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।  সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এআই ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখানো উচিত।  পাশাপাশি মৌলিক লেখার দক্ষতা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।  প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সাংবাদিকতা তার মান বজায় রাখতে পারবে।
নৈতিকতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এআই-নির্ভর প্রতিবেদনে অনেক সময় ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকার ঝুঁকি থাকে।  তাই তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব সাংবাদিকেরই।  কোনো তথ্য প্রকাশের আগে তা নিশ্চিত করা পেশাগত দায়িত্বের অংশ। এই দায়িত্ব কোনো যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
পরিশেষে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংবাদিকতার জন্য একদিকে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে এটি একটি সতর্কবার্তাও নিয়ে এসেছে।  এটি যেমন কাজকে সহজ করছে, তেমনি সৃজনশীলতা ও মৌলিকতার জন্য চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।  তাই প্রয়োজন সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পেশাগত দায়িত্ববোধ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি কখনো মানুষের বিকল্প নয়; এটি কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত শক্তি তার চিন্তা, অনুভূতি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতায়।  এই শক্তিকে ধরে রেখেই যদি আমরা এআই-কে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে এটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। আর যদি আমরা অন্ধভাবে এর ওপর নির্ভর করি, তাহলে একসময় আমাদের সৃজনশীলতা এবং পেশাগত স্বাতন্ত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
সুতরাং, সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—আমরা কি যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হব, নাকি যন্ত্রকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করব? সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপরই।
লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, এমসিএস, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স।

সরকার সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ডেটাবেজ করছে : তথ্যমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৫২ অপরাহ্ণ
সরকার সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ডেটাবেজ করছে : তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন, প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা নিশ্চিতকরণ ও ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণসহ অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রোববার (১৯ এপ্রিল ২০২৬) বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের লিখিত এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান তিনি। বিকেল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীম লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ভুয়া সংবাদ প্রতিরোধ এবং আধুনিক সম্প্রচার ব্যবস্থায় উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সুষ্ঠু বিকাশ, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমতাবস্থায়, ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার প্রতিরোধে তথ্য ও সম্প্রচারের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার প্রতিরোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) কর্তৃক এআই প্রশিক্ষণ, ন্যারেটিভ তৈরি, তথ্যের বিষয়ে নীতিসহায়তা ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতি মাসে ঢাকার বাইরে ৪টি এবং ঢাকায় ২টি কর্মশালা বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে। প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি করে সাংবাদিক নেতাদের নিয়ে ঢাকায় এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের অভ্যন্তরে কর্মরত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং ও ভুয়া খবর নিয়ে বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা, মূলধারার সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনাসভা ও সেমিনার আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
তিনি আরও বলেন, ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচাররোধে বর্তমান সরকারের সময়ে তথ্য অধিদপ্তর হতে ২২টি ফটোকার্ড ও গুজব প্রতিরোধবিষয়ক ১০টি তথ্যবিবরণী বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও নিউজ পোর্টালে প্রকাশের জন্য পাঠানো হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ১২ ধারা অনুযায়ী, কোনো সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থার সাংবাদিক, সম্পাদক কর্তৃক সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা ও জনরুচি পরিপন্থি সংবাদ প্রচারের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী, প্রেস কাউন্সিলে দায়েরকৃত ৮টি অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে। সাংবাদিকদের অপসাংবাদিকতা পরিহার করে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের ৩২টি জেলায় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে গণমাধ্যমের অপসংবাদিকতা প্রতিরোধ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করেছে। এছাড়া অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন, প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা নিশ্চিতকরণ ও ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণসহ অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

জনগণের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে সরকার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে

মুহাম্মদ বাদশা ভূঁইয়া, চাঁদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
জনগণের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে সরকার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবীতে চাঁদপুর পৌর জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছেন জেলা ও পৌর জামায়াতের নেতৃবৃন্দ। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে শহরের বাইতুল আমীন চত্বর থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকায় এ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। এ সময় সাধারণ মুসল্লী, ব্যবসায়ী, যানবাহন চালক ও পথচারীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেন দলটির নেতাকর্মীরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জননেতা মো: শাহজাহান মিয়া। তিনি বলেন, “দেশব্যাপী গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আমাদের এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে সরকার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ একইসঙ্গে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার সেই রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর শহর জামায়াতে ইসলামীর আমির অ্যাডভোকেট শাহজাহান খান, সেক্রেটারি মোঃ বেলায়েত হোসেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুল হাই লাভলু, জাহাঙ্গীর পাটওয়ারী, তরপুরচন্ডী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলমগীর বন্দুকশীলসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা। এ সময় বক্তারা বলেন, জনগণের মতামতকে সম্মান না করলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তারা সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রমের সমালোচনা করে বর্তমান পরিস্থিতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে বলেও দাবি করেন।
লিফলেটের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয় এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।

চাঁদপুরে পুরানবাজার ভূঁইয়ার ঘাটে পন্টুন সংকটে বাড়ছে দুর্ঘটনা ঝুঁকি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
চাঁদপুরে পুরানবাজার ভূঁইয়ার ঘাটে পন্টুন সংকটে বাড়ছে দুর্ঘটনা ঝুঁকি

চাঁদপুরের পুরানবাজার এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্য কেন্দ্র।  এ বাণিজ্য কেন্দ্রের ভূঁইয়ার ঘাট দীর্ঘদিন ধরে পল্টুন সংকটে ভুগছে।  এ সংকট এখন শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমিয়ে দিচ্ছে না বরং প্রতিদিনই বাড়িয়ে তুলছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের অভিযোগ—বারবার দাবি জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি, ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর জেলার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পুরানবাজারের এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়। মেঘনা নদী ও ডাকাতিয়া নদী সংলগ্ন এ ঘাটটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ওঠানামার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু বর্তমানে এখানে মাত্র একটি পন্টুন থাকায় সেই সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে নদীর পানির স্তর কমে গেলে পন্টুনটি কার্যত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে করে নৌযান থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের অনেক সময় সরাসরি নৌকা থেকে পণ্য মাথায় নিয়ে পিচ্ছিল ও অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে ওঠানামা করতে হয়, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ইতোমধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেও বড় কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটায় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।
চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, ২০১৭ সালের মে মাসে আমরা বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালকের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছিলাম। তখন দেওয়ানঘাট, ১নং ঘাট এবং জনতা মিল সংলগ্ন নতুন রাস্তার মাথায় তিনটি পল্টুন স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে সময় আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, এই ঘাটটি শুধু পুরানবাজার নয়, পুরো চাঁদপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পল্টুন সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক একটি বিষয়।
চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব নাজমুল আলম পাটওয়ারী বলেন, আমরা বহুবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি। প্রতিদিন শত শত টন পণ্য এই ঘাট দিয়ে ওঠানামা করে। পর্যাপ্ত পল্টুন না থাকায় সময় বেশি লাগছে, খরচ বাড়ছে এবং ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। আমরা চাই না এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটুক। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা ও জনতা লবণ মিলসের মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভূঁইয়ার ঘাটের পন্টুনটি পুরানবাজারের ব্যবসার প্রাণ। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য নৌযান ভিড়ে। কিন্তু একটি মাত্র পন্টুন দিয়ে সেই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নতুন পল্টুন স্থাপন না করলে ব্যবসার গতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
শ্রমিকদের অবস্থাও খুবই নাজুক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। পন্টুন ঠিকমতো না থাকায় অনেক সময় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কেউ পড়ে গেলে তাকে বাঁচানোও কঠিন হয়ে যায়। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজ করতে হচ্ছে।
অন্য এক শ্রমিক বলেন, বর্ষাকালে কিছুটা সুবিধা থাকলেও শুকনো মৌসুমে কাজ করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। পন্টুন নিচে নেমে যায়, তখন আমাদের অস্থায়ীভাবে কাঠ বা বাঁশ দিয়ে ব্যবস্থা করতে হয়। এটা খুবই বিপজ্জনক।
এ বিষয়ে বন্দর কর্মকর্তা বলেন, আমি বিষয়টি নতুনভাবে জেনেছি। খুব শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবো। এরপর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করবো। প্রয়োজনে সেখানে জেটি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু আশ্বাসে আর কাজ হবে না। দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা মনে করেন, অন্তত তিনটি নতুন পন্টুন স্থাপন করা হলে বর্তমান সংকট অনেকটাই দূর হবে। পাশাপাশি একটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। নদীবন্দরভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে পর্যাপ্ত পন্টুন না থাকলে শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, মানবিক ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নতুন পন্টুন স্থাপন ও আধুনিক জেটি নির্মাণের মাধ্যমে ভূঁইয়ার ঘাটকে একটি নিরাপদ ও কার্যকর নৌবাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন ব্যবসার গতি বাড়বে, তেমনি শ্রমিকদের জীবনও নিরাপদ হবে।
পুরানবাজারের ভূঁইয়ার ঘাটের পন্টুন সংকট এখন আর শুধুমাত্র একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়—এটি হয়ে উঠেছে জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।  দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগই পারে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান এনে দিতে।