খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

প্রবীণ জীবন সমাজ ও অভিজ্ঞতার আয়নায়

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ৩:৫১ অপরাহ্ণ
প্রবীণ জীবন সমাজ ও অভিজ্ঞতার আয়নায়

প্রবীণ জীবন সমাজ ও অভিজ্ঞতার আয়নায়
উজ্জ্বল হোসাইন
প্রবীণরা সমাজের অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান অংশ। তাঁদের জীবন সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা সমাজের জন্য অমূল্য সম্পদ। প্রবীণদের জীবন কেবলই বার্ধক্যের গল্প নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ পথচলার প্রতিচ্ছবি, যেখানে রয়েছে ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া, পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সমাজে প্রবীণদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত, তাঁদের অভিজ্ঞতার মূল্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এবং কীভাবে তাঁদের জীবনকে আরো সম্মানজনক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করা যায়—এসব বিষয় প্রবন্ধে বিশদভাবে আলোচনা করা হবে।
প্রবীণদের অভিজ্ঞতা একটি সমাজের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ। তাঁদের সংগ্রামী জীবন, কাজের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক দায়িত্ব, নৈতিক শিক্ষা—এসবই নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। একজন প্রবীণ ব্যক্তি জীবনে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁরা দেখেছেন কিভাবে সমাজ পরিবর্তিত হয়েছে, জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে, আবার কখনো কঠিন চ্যালেঞ্জ এসেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। প্রবীণদের কাছ থেকে পারিবারিক বন্ধন, ত্যাগ, ভালোবাসা ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা পাওয়া যায়। অতীত প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পারিবারিক সম্পর্ককে মজবুত করতে সহায়ক হতে পারে। প্রবীণরা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কঠোর পরিশ্রম করেছেন, দেশ ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের কর্মজীবনের গল্প পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, বিশেষ করে যখন একজন তরুণ ব্যক্তি নিজের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। একটি সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হলো প্রবীণদের যথাযথ সম্মান ও যত্ন প্রদান করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক সমাজেই প্রবীণদের অবহেলা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রবীণদের কথা গুরুত্বসহকারে শোনা হয় না। তাঁদের সিদ্ধান্ত ও মতামতকে মূল্যহীন মনে করা হয়, যা তাঁদের মানসিকভাবে কষ্ট দেয়। অনেক প্রবীণ মানুষ একাকীত্বে ভোগেন, বিশেষ করে যদি তাঁরা পরিবারের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হন। আধুনিক সমাজে কর্মব্যস্ত জীবনধারার কারণে অনেক সময় সন্তানরা বাবা-মাকে যথাযথ সময় দিতে পারেন না, যা প্রবীণদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সমাজের উচিত প্রবীণদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। তাঁদের প্রতি সহানুভূতি, যত্ন ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত। প্রবীণদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য পরিবার, সমাজ ও সরকারকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। তাই প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতা ও উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রবীনদের শারীরিক সুস্থতার জন্য-সুষম খাদ্য গ্রহণ করা, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ও হালকা ব্যায়াম করা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পরিবার ও সমাজের সাপোর্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। একাকীত্ব, অবহেলা ও মানসিক চাপ প্রবীণদের বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই—তাঁদের সাথে সময় কাটানো, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে যুক্ত রাখা, প্রযুক্তির এই যুগে প্রবীণদের ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে পরিচিত করানো দরকার। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যাংকিং, টেলিমেডিসিন ইত্যাদি শেখানোর মাধ্যমে তাঁদের জীবনকে সহজ করা সম্ভব।অনেক প্রবীণ মানুষ প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হলেও তাঁদের শেখানোর মতো কেউ থাকে না। তরুণ প্রজন্ম যদি তাঁদের সাহায্য করে, তাহলে তাঁরা প্রযুক্তির সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন এবং একাকীত্ব কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
প্রবীণদের জন্য করণীয় উদ্যোগ হলো- পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব, প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ করা, তাঁদের সাথে সময় কাটানো, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার খোঁজ রাখা, প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, প্রবীণ ভাতা ও অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করা, প্রবীণদের জন্য বিনোদনমূলক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। অনেক দেশে প্রবীণদের জন্য বিশেষ সংগঠন রয়েছে, যেখানে তাঁরা সময় কাটাতে পারেন, বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন এবং নিজেদের মতামত ভাগ করে নিতে পারেন। আমাদের সমাজেও প্রবীণদের জন্য এমন সংগঠন গড়ে তোলা উচিত।
প্রবীণরা আমাদের সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, এবং অর্জন নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস। জীবনের প্রতিটি ধাপে তাঁরা সংগ্রাম করেছেন, সমাজ ও পরিবারের কল্যাণে কাজ করেছেন এবং দেশ ও জাতির অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার পর অনেক প্রবীণ মানুষ অবহেলা ও একাকীত্বের শিকার হন। প্রবীণদের জীবন শুধু দীর্ঘ সময়ের সমষ্টি নয়; এটি সংগ্রামের, অর্জনের, শিক্ষা ও মূল্যবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সমাজ ও পরিবার গঠনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।
পারিবারিক ও সামাজিক অবদান : প্রবীণরা পরিবারের মূল ভিত্তি। তাঁদের অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা ও আদর্শ পরিবার ও সমাজের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। তাঁরা সন্তানদের লালন-পালন করেন, শিক্ষা দেন, এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা : একজন প্রবীণ ব্যক্তি জীবনের বেশিরভাগ সময় কর্মক্ষেত্রে অতিবাহিত করেন। শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক—যে কোনো পেশাতেই থাকুক না কেন, তাঁরা সমাজের অগ্রগতির অংশ। তাঁদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান হতে পারে, যদি সেটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সাক্ষী : প্রবীণরা অতীতের জীবন্ত দলিল। তাঁরা একসময়ে প্রত্যক্ষ করেছেন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, যুদ্ধ, বিপ্লব, প্রযুক্তির অগ্রগতি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এসব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রবীণদের প্রতি সমাজের দায়িত্ব : একটি উন্নত ও মানবিক সমাজের চিহ্ন হলো প্রবীণদের প্রতি যথাযথ যত্ন ও সম্মান প্রদান করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অনেক প্রবীণ মানুষ বার্ধক্যে একাকীত্ব ও অবহেলার শিকার হন। সমাজের উচিত প্রবীণদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সম্মানের চোখে দেখা। তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, পারিবারিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা, এবং তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণরা বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হন। তাঁদের জন্য উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, এবং মানসিক প্রশান্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। পরিবার ও সমাজের উচিত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং মানসিক সমর্থন দেওয়া। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর উচিত প্রবীণদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা, যেমন : বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে যানবাহনে যাতায়াত, প্রবীণ ভাতা ও পেনশন সুবিধা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ
প্রবীণদের চ্যালেঞ্জ ও সমাধান : বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেক প্রবীণ মানুষ একাকীত্বে ভোগেন। সন্তানরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বন্ধুরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই বাইরে যেতে পারেন না। ফলে তাঁরা মানসিক অবসাদে ভোগেন। পরিবারের উচিত নিয়মিত সময় দেওয়া, প্রবীণদের জন্য সামাজিক সংগঠন তৈরি করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা, অনেক প্রবীণ মানুষ কর্মক্ষমতা হারানোর পর আর্থিক সংকটে পড়েন। পেনশন ব্যবস্থা না থাকলে বা পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকলে তাঁদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে যায়। প্রবীণ ভাতা ও পেনশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বয়স্কদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, আর্থিক সহায়তার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, যেমন : উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বাত, হৃদরোগ ইত্যাদি। অনেক প্রবীণ মানুষ সঠিক চিকিৎসা পান না। বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা। প্রবীণদের জন্য বিশেষ হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপন করা।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি প্রতিটি ক্ষেত্রকে সহজ করে তুলেছে, কিন্তু প্রবীণদের অনেকেই ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে তাঁরা ব্যাংকিং, টেলিমেডিসিন, অনলাইন যোগাযোগ ইত্যাদি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। প্রবীণদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়া। সহজ ও ব্যবহারবান্ধব প্রযুক্তি তৈরি করা। পরিবারের তরুণদের উচিত প্রবীণদের ডিজিটাল দক্ষতা শেখানো।
প্রবীণদের জন্য করণীয় : প্রবীণদের জীবনকে সুন্দর ও সম্মানজনক করতে তাঁরা নিজেরাও কিছু উদ্যোগ নিতে পারেন। সক্রিয় ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। নিয়মিত ব্যায়াম করা। সুষম খাদ্য গ্রহণ করা। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া। সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকা। বন্ধু ও পরিবারের সাথে সময় কাটানো। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা। বই পড়া, লেখালেখি করা বা নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা
ছোটখাটো ব্যবসা বা হস্তশিল্পে যুক্ত থাকা। পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করা। ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন কাজ শেখা
প্রবীণরা আমাদের সমাজের ইতিহাসের ধারক এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনের প্রেরণা। তাঁদের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও পরামর্শ আমাদের জন্য অমূল্য সম্পদ। প্রবীণদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও যত্ন নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। একটি সুস্থ, মানবিক ও উন্নত সমাজ গড়তে হলে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি। তাঁদের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে তাঁরা বার্ধক্যেও সম্মানজনক ও সুখী জীবনযাপন করতে পারবেন। প্রবীণরা আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতার ধারক ও বাহক। তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ আমাদের জীবনের জন্য অমূল্য সম্পদ। প্রবীণদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও যত্ন প্রদর্শন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
সমাজের সকল স্তরের মানুষের উচিত প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং তাঁদের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে তোলার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা। প্রবীণদের প্রতি আমাদের সম্মান ও ভালোবাসাই প্রমাণ করে আমরা কতটা সভ্য ও মানবিক সমাজে বাস করি।
লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, চাঁদপুর।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।