খুঁজুন
                               
সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৭ বৈশাখ, ১৪৩৩

বিষ্ণপুরবাসীকে প্রকৃত সেবা দিতে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে চাই : এনাম চৌধুরী

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
বিষ্ণপুরবাসীকে প্রকৃত সেবা দিতে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে চাই : এনাম চৌধুরী

চাঁদপুর জেলার ১নং বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট সমাজসেবক ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব গোলাম ইয়াজদানী চৌধুরী (এনাম)। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত এই সদালাপী মানুষটি এবার সরাসরি জনপ্রতিনিধি হয়ে ইউনিয়নের উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মনোহরখাদী চৌধুরী বাড়ির কৃতী সন্তান এনাম চৌধুরী একটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত পরিবারের উত্তরসূরি। তার পিতা গোলাম জিলানী চৌধুরী এবং মাতা সালেহা চৌধুরীর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিনি নিজেও জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গোলাম মোস্তফা চৌধুরী (দুইবার), গোলাম মাওলা চৌধুরী মানিক মিয়া (ছয়বার) এবং গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী (একবার) বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে এনাম চৌধুরীও নিজেকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত করতে চান।
একান্ত সাক্ষাাতে এনাম চৌধুরী বলেন, আমি এনাম চৌধুরী ১নং বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্য আগ্রহী। মূলত জনগণের আহ্বান, ভালোবাসা এবং ইউনিয়নের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের অভাব-অভিযোগ আমাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি জানান, শুরুতে তার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু গত প্রায় ১৫ বছরে ইউনিয়নের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দেখে তার মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, আমাদের ইউনিয়নের অনেক অবহেলিত মানুষ রয়েছে, যারা এখনো মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য কিছু করতে হলে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন, আর সেটি হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ।
এনাম চৌধুরী আরও বলেন, তাদের পরিবার দীর্ঘ ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে এই ইউনিয়নের মানুষের পাশে ছিল। এখনও তারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। ফলে ইউনিয়নবাসীর সঙ্গে তাদের একটি গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সেই আস্থা ও ভালোবাসা তার নির্বাচনী যাত্রাকে আরও শক্তিশালী করবে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে তিনি জানান, তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন নিবেদিত কর্মী। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউনিয়ন পর্যায়ে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় তিনি নির্দলীয়ভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। যদিও দলের নেতাকর্মীদের সমর্থন তিনি পাবেন বলে আশাবাদী। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান যুবদল সভাপতি মানিকুর রহমান মানিক তার শৈশবের বন্ধু এবং ১৯৯১ সালে ছাত্রদলের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এনাম চৌধুরী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি শুধুমাত্র পরিচিতি লাভের জন্য নির্বাচন করতে চাই না। আমি নির্বাচিত হওয়ার জন্যই মাঠে নামতে চাই। কারণ এই ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি মানুষ আমাকে ও আমার পরিবারকে চেনে। তিনি জানান, এর আগে তিনি সরাসরি কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি, তবে ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও জনসংযোগ সম্পর্কে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। নির্বাচনী পরিকল্পনা সম্পর্কে এনাম চৌধুরী বলেন, তার লক্ষ্য একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ ও স্বনির্ভর ইউনিয়ন গড়ে তোলা। তিনি মনে করেন, উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করাই প্রকৃত উন্নয়ন। তিনি বলেন, আমাদের ইউনিয়নে উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়ন—এসব ক্ষেত্রেই কাজ করতে চাই।
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের পরিবার সবসময়ই বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। ইতোমধ্যে তিনি ভোটারদের সঙ্গে গণসংযোগ শুরু করেছেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের মতামত নিচ্ছেন। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেবে। আমরা চাই, জনগণের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রতিফলিত হোক। ভোটারদের উদ্দেশ্যে এনাম চৌধুরী বলেন, আমাদের ইউনিয়ন শুধু একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়—এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের ভবিষ্যৎ। এই উন্নয়নের দায়িত্ব আমাদের সবার। আমি একা কিছু করতে পারবো না, তবে সবার সহযোগিতা পেলে অবশ্যই একটি মডেল ইউনিয়ন গড়ে তুলতে পারবো।
তিনি দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য এই দুটি বিষয়কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ জন্য তিনি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন। এনাম চৌধুরী আরও বলেন, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, সততার সঙ্গে কাজ করি, তাহলে কোনো বাধাই আমাদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে না। আমি চাই, আমাদের সন্তানরা একটি নিরাপদ, শিক্ষিত ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠুক।
নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিতে তিনি জানান, তিনি চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে ঢাকায় একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন, যেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি নিজস্ব একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। সর্বশেষে তিনি ইউনিয়নবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, আমি আপনাদের দোয়া ও সমর্থন কামনা করছি। আমরা সবাই মিলে এমন একটি বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন গড়ে তুলবো, যা হবে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনাম চৌধুরীর পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা তাকে একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে নির্বাচনের মাঠে অন্যান্য প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেমন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সবমিলিয়ে, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এনাম চৌধুরীর নাম আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসায় নির্বাচনটি যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে, তা বলাই যায়।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।