১৬৬ কিমি মহাসড়কের বাঁকে ৭০ ‘মৃত্যুফাঁদ’

একটি বাঁক পেরোতেই সামনে আরেকটি বাঁক। কোথাও বাঁক এতটাই তীক্ষ্ণ যে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন শেষ মুহূর্তের আগে দেখা যায় না। কোথাও আবার সড়কের দুই পাশে গাছপালা, বাজার ও স্থাপনার কারণে দৃষ্টিসীমা আরও কম। এর মধ্যেই চলছে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাসসহ নানা ধরনের যানবাহন। ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতায় সামান্য ভুলেই ঘটছে মুখোমুখি সংঘর্ষ। কেউ ছিটকে পড়ছেন খাদে, কেউ চাপা পড়ছেন সড়কের পাশে। বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১৬৬ কিলোমিটার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে এমন বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে অন্তত ৫০টি। পরিবহন মালিক ও চালকদের হিসাবে সংখ্যাটি প্রায় ৭০। তাদের হিসাবে, এর মধ্যে অন্তত ৪০টি বাঁক দুর্ঘটনাপ্রবণ। বছরের পর বছর এসব বাঁকের অনেকগুলো একই অবস্থায় থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
স্থানীয় বাসচালক, পরিবহন মালিক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি শুধু চালকদের অসচেতনতার কারণে তৈরি হচ্ছে না। সরু সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, যানবাহনের বাড়তি চাপ, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো—সব মিলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলেছে। অথচ অবকাঠামোগত এসব ঝুঁকির অনেকগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
পদ্মা সেতুর পর বেড়েছে যানবাহনের চাপ
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালুর আগে ঢাকা–কুয়াকাটা মহাসড়কের বরিশালের ভূরঘাটা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১৬ থেকে ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করত। পদ্মা সেতু চালুর পর এ সংখ্যা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের ছুটিতে যানবাহনের চাপ আরও বেড়ে যায়। অন্যদিকে, মহাসড়কের বড় একটি অংশ এখনও মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত দুই লেনের। ফলে পদ্মা সেতু পেরিয়ে দ্রুতগতিতে আসা যানবাহন তুলনামূলক সরু এই মহাসড়কে ঢোকার পর গতি নিয়ন্ত্রণ না করলে বাঁকগুলো বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়। বিশেষ করে মাদারীপুর থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত অংশে এ সমস্যা প্রকট বলে জানিয়েছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
যেসব বাঁকে বেশি ঝুঁকি
বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কের উজিরপুরের সানুহার, গৌরনদীর ভূরঘাটা ব্রিজ ও ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, কটকস্থল, পিঙ্গলাকাঠি, কসবা, বাবুগঞ্জের নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ, পাংশা, সাতমাইল, ছয়মাইল, বরিশাল সদরের গড়িয়ারপার, কাশিপুর, রেইন্ট্রিতলা, খয়রাবাদ ব্রিজের পরের অংশ, দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, বাকেরগঞ্জের লক্ষ্মীপাশা, বোয়ালিয়া, ভরপাশা, রেইন্ট্রিতলা, চরামদ্দি, আমতলীর শাখারিয়া ও ব্রিকস ফিল্ড এবং কলাপাড়ার মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেঁওড়াবুনিয়া এলাকায় একাধিক বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসচালক ও পরিবহন মালিকেরা।
তাদের ভাষ্য, এসব বাঁকের কয়েকটি এতটাই তীক্ষ্ণ যে বিপরীত দিকের যানবাহন সামনে না আসা পর্যন্ত চালকেরা তা দেখতে পান না। শীতকালে কুয়াশার কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন কোম্পানিগুলোর আগে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা। ফলে বাঁক এলাকাতেও অনেক চালক ওভারটেকের চেষ্টা করেন। বাসচালক মোহাম্মদ নয়ন বলেন, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ভূরঘাটা পর্যন্ত মহাসড়কে প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ থেকে ১৯টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পদ্মা সেতু চালুর পর এই সড়কে দ্রুতগতির যানবাহন বেড়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে এসব যানবাহন যখন ২৪ ফুট প্রশস্ত সড়কে ঢোকে, তখন একের পর এক বাঁকের কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ওপর রয়েছে বাস কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা। নিয়মিত এই রুটে গাড়ি চালানো চালকেরাও যখন দুর্ঘটনার শিকার হন, তখন নতুন চালকদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ভূরঘাটা থেকে নথুল্লাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৫৬ কিলোমিটার সড়কে ৪০ থেকে ৪২টি বাঁক রয়েছে। এসব বাঁকে বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়েছে অথবা বিপরীত দিকের যানবাহনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে।
পটুয়াখালী অংশেও ২০ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক
পটুয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাবে, লেবুখালী পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি স্থানে সতর্কতামূলক চিহ্নও দেওয়া হয়েছে। বাঁকগুলো সোজা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভাগটি। পটুয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জামিল আক্তার লিমন এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সোজা করার কাজ করা যাবে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাবের সঙ্গে একমত নন পরিবহন মালিকেরা। পটুয়াখালী জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ইমাম হোসেন নাসির বলেন, পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্তই প্রায় ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এ পথে দেড় শতাধিক আঞ্চলিক বাস চলাচল করে। বিশেষ করে শীতকালে কুয়াশার কারণে এসব বাঁকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বাঁকগুলো সোজা করার জন্য সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষকে বারবার বলা হয়েছে।
পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে নিহত ২,৩৮৭
অবকাঠামোগত ঝুঁকির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে দুর্ঘটনার সামগ্রিক পরিসংখ্যানও। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ২ হাজার ৩৮৭ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৫২৪টি দুর্ঘটনায় ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৪৩০টি দুর্ঘটনায় ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪৩৬টি দুর্ঘটনায় ৪১১ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৯টি দুর্ঘটনায় ৪৫৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪২১ জন নিহত হন।
অর্থাৎ পাঁচ বছরে নথিভুক্ত দুর্ঘটনায় বরিশাল বিভাগে গড়ে প্রতিদিন একাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে এই পরিসংখ্যান পুরো বরিশাল বিভাগের; শুধু বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কে নিহতের সংখ্যা নয়। এ মহাসড়কের পৃথক পাঁচ বছরের সমন্বিত মৃত্যুর তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, বরিশাল বিভাগের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় একটি অংশ বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের দুর্ঘটনার শিকার। পদ্মা সেতুর পর যানবাহনের গতি ও সংখ্যা দুটোই বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সড়কের সক্ষমতা বাড়েনি।
তিনি বলেন, ২৪ ফুট প্রশস্ত সরু সড়কে দ্রুতগতির বাসের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহনও চলছে। বাঁক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। চালকদের সচেতনতার পাশাপাশি পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন চালককে দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো থেকেও বিরত রাখতে হবে। ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালালে চালকের ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশস্ত হচ্ছে কিছু অংশ, বসানো হচ্ছে সতর্কতামূলক চিহ্ন
সড়ক ও জনপথ বিভাগ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের বরিশাল অংশে ৩৬টি বাঁক চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁকের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ২৪ ফুট থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করা হয়েছে। কোথাও কাজ চলছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, ডানে-বাঁয়ে মোড়, ‘ধীরে চলুন’ ও নির্ধারিত গতিসীমার সতর্কতামূলক চিহ্ন বসানো হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও দুর্ঘটনা না কমার জন্য তিনি চালকদের অসচেতনতা ও অতিরিক্ত গতিকে দায়ী করেন।
চার ধরন বাদে সব মোটরযানের জন্য বিআরটিএর কড়া সতর্কবার্তা
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কটি দুই লেনের এবং গড়ে ২৪ ফুট প্রশস্ত। পদ্মা সেতু চালুর পর এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। সরু সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেসব স্থানে সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে; কোথাও কোথাও কাজ চলছে। বাজার এলাকায় স্পিডব্রেকারসহ বিভিন্ন মোড়ে সতর্কতামূলক চিহ্নও দেওয়া হয়েছে। এরপরও দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমছে না। মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
চালকের ভুলেও বাড়ছে দুর্ঘটনা
বরিশাল বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক জিয়াউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২০২২ সালের একটি দুর্ঘটনার ঘটনায় বাকেরগঞ্জ থেকে যমুনা লাইন পরিবহনের এক চালককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। পরে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হয়। এ ধরনের ঘটনায় চালকের অসচেতনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করলে বিধি অনুযায়ী মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাস টার্মিনালগুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হয়।

আপনার মতামত লিখুন