খুঁজুন
                               
, ,

চাঁদপুরের কৃতী সন্তান উজ্জ্বল হোসাইন

সাংবাদিকতা তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও সমাজসংগঠনে যাঁর বহুমাত্রিক পথচলা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ
সাংবাদিকতা তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও সমাজসংগঠনে যাঁর বহুমাত্রিক পথচলা

চাঁদপুরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রযুক্তির অঙ্গনে যে কজন মানুষ একই সঙ্গে নানা ক্ষেত্রে সক্রিয় থেকে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন, উজ্জ্বল হোসাইন তাঁদের অন্যতম।  লেখক, সাংবাদিক, সংগঠক, গবেষক, আইটি বিশেষজ্ঞ, আয়কর আইনজীবী এবং সমাজকর্মী—বহুমাত্রিক এই পরিচয়গুলো তাঁর কর্মজীবনের বিস্তৃত পরিসরকে তুলে ধরে। ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে তিনি চাঁদপুরের নাগরিক সমাজে একটি সক্রিয় অবস্থান তৈরি করেছেন।
১৯৮৩ সালের ১০ আগস্ট চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের উত্তর বলাশিয়া মাঝি বাড়ির এক মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম।  নদীমাতৃক চাঁদপুরের একটি প্রত্যন্ত জনপদে বেড়ে ওঠা একজন তরুণের তথ্যপ্রযুক্তি, সাংবাদিকতা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং সামাজিক নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে এগিয়ে যাওয়ার এই যাত্রা মূলত আত্মপ্রত্যয়, বহুমুখী জ্ঞানচর্চা এবং সংগঠনভিত্তিক সমাজসম্পৃক্ততার একটি উদাহরণ।
উজ্জ্বল হোসাইনের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহের প্রতিফলন দেখা যায়।  তিনি আমিরাবাদ গোলাম কিবরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১৯৯৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।  পরবর্তীতে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি এবং স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি বিভিন্ন জ্ঞানক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বিজ্ঞান শিক্ষার পাশাপাশি আইন, কম্পিউটার, গ্রাফিক ডিজাইন, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম এবং সর্বশেষ শাসনব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণ বিষয়ে তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।
চাঁদপুর ল’ কলেজ থেকে তিনি ব্যাচেলর অব ল’ (খখ.ই.) ডিগ্রি অর্জন করেন।  ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া থেকে কম্পিউটার বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের-এর অধীনে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। এর পাশাপাশি জাতীয় বোর্ডের সনদপ্রাপ্ত আয়কর আইনজীবী হিসেবেও তিনি পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারিক জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করতে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ডিপ্লোমা ইন ডাটাবেজ প্রোগ্রামিং এবং ডিপ্লোমা ইন গ্রাফিক ডিজাইন কোর্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অব গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজে অধ্যয়নরত এবং এমফিল গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত।
এই শিক্ষাযাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর একাডেমিক আগ্রহ মূলত তিনটি পরস্পরসম্পর্কিত ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে—প্রযুক্তি, গণমাধ্যম এবং শাসন ও নীতি অধ্যয়ন। আধুনিক সমাজে এই তিনটি ক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উজ্জ্বল হোসাইনের কর্মপরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাংবাদিকতা। স্থানীয় সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
চাঁদপুরের বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ’-এ তিনি সিস্টেম ডেভেলপার ও স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে তাঁর দায়িত্ব প্রযুক্তি ও সাংবাদিকতার দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেছে।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক ‘বাংলা কাগজ’-এর চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে স্থানীয় সংবাদকে জাতীয় পরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
অনলাইন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয়। তিনি চাঁদপুর পোস্ট অনলাইন-এর সম্পাদক এবং ডেইলি রূপসী বাংলা ডটকম-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি অনলাইন সাংবাদিক ফোরামের কার্যকরী সদস্য।
তাঁর সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানকে সাংবাদিকতার সঙ্গে সমন্বয় করা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংবাদ ব্যবস্থাপনা, ওয়েব প্রযুক্তি, ডিজিটাল কনটেন্ট, গ্রাফিক্স, অনলাইন প্রকাশনা এবং তথ্যের দ্রুত পরিবেশনও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উজ্জ্বল হোসাইনের পেশাগত পরিচয়ে সাংবাদিকতা ও আইটি দক্ষতার সমন্বয় এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তথ্যপ্রযুক্তি তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বর্তমানে তিনি চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে আইটি অফিসার হিসেবে কর্মরত। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় একজন আইটি পেশাজীবীর দায়িত্ব শুধু কম্পিউটার পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তথ্য সংরক্ষণ, ডেটাবেজ, ডিজিটাল যোগাযোগ, সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যপ্রবাহকে কার্যকর রাখাও এর অংশ।
বাংলাদেশের অন্যতম সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জ বিডি লিমিটেডের চাঁদপুর শাখায় ব্রাঞ্চ কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও সফটওয়্যারভিত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তাঁর ডাটাবেজ প্রোগ্রামিং ও গ্রাফিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিসরে তাঁকে বাড়তি দক্ষতা দিয়েছে। সাংবাদিকতা, অনলাইন প্রকাশনা ও সংগঠন পরিচালনায় এই দক্ষতার ব্যবহার তাঁর কর্মজীবনের বহুমুখিতা আরও স্পষ্ট করে।
চাঁদপুরকে ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রে তাঁর একটি সৃজনশীল অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম ব্র্যান্ডিং জেলা হিসেবে চাঁদপুরের পরিচিতি নির্মাণে ব্যবহৃত ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ ব্র্যান্ড বুকের গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে তিনি কাজ করেছেন।
একটি জেলার ব্র্যান্ডিং শুধু একটি স্লোগান বা লোগো তৈরির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, পর্যটন, সংস্কৃতি, খাদ্য, নদী ও মানুষের জীবনধারাকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে তুলে ধরার বিষয়টি জড়িত। চাঁদপুরের ক্ষেত্রে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ পরিচিতি জেলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যকে একটি ব্র্যান্ড-ভাবনায় উপস্থাপন করে।
এই প্রকল্পে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততা তথ্যপ্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সমন্বিত প্রয়োগের একটি দৃষ্টান্ত।
উজ্জ্বল হোসাইনের সাংগঠনিক জীবনের দীর্ঘতম অধ্যায়গুলোর একটি হলো রোটারি। ঐতিহ্যবাহী চাঁদপুর রোটারি ক্লাব-এর সঙ্গে তাঁর প্রায় এক দশকেরও বেশি সময়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
২০২৩-২৪ রোটারি বর্ষে তিনি ক্লাবের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আগামী ২০২৭-২৮ রোটারি বর্ষে তিনি ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মনোনীত হয়েছেন।
রোটারি একটি আন্তর্জাতিক সেবামূলক আন্দোলন। স্থানীয় পর্যায়ে এর কার্যক্রমকে কার্যকর করার জন্য সাংগঠনিক দক্ষতা, পরিকল্পনা, যোগাযোগ এবং স্বেচ্ছাসেবী নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। উজ্জ্বল হোসাইনের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা তাঁকে স্থানীয় সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত রেখেছে।
রোটারির যুব সংগঠন চাঁদপুর রোটারেক্ট ক্লাব-এর ২০১৩-১৪ রোটারি বর্ষে তিনি সভাপতি ছিলেন। যুব নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে আরও বিস্তৃত করেছে।
চাঁদপুর রোটারি ক্লাবের অভিষেক স্মরণিকার বিগত প্রায় দশ বছরের প্রকাশনা কার্যক্রমে তাঁর সম্পৃক্ততাও উল্লেখযোগ্য। স্মরণিকা সম্পাদনা, তথ্য সংগ্রহ, ডিজাইন ও প্রকাশনা একটি সংগঠনের বার্ষিক কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য দলিল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও উজ্জ্বল হোসাইনের সক্রিয় সম্পর্ক রয়েছে। তিনি থিয়েটার ফোরাম, চাঁদপুরের জয়েন্ট সেক্রেটারি এবং নটমঞ্চ, চাঁদপুরের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া তিনি শিশু থিয়েটার চাঁদপুরের সহ-সভাপতি। নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মানুষের সৃজনশীলতা, মানবিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং যুক্তিবোধ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নটমঞ্চের নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি নাট্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টায় রয়েছেন।
উজ্জ্বল হোসাইন চাঁদপুর যুব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং প্রত্যয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ দুটি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি তরুণদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
তাঁর সংগঠনভিত্তিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তরুণদের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করা। সমাজের পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় যুবসমাজকে ইতিবাচক কাজে যুক্ত করা সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।
এছাড়া তিনি চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর বিতর্ক আন্দোলনের সাবেক এলিট সদস্য এবং কালের কণ্ঠ শুভ সংঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিতর্কচর্চার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহেরও পরিচায়ক। বিতর্ক একজন মানুষের যুক্তি উপস্থাপন, তথ্য বিশ্লেষণ, মতের পার্থক্যকে গ্রহণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতা বাড়ায়।
সামাজিক দায়িত্ববোধের আরেকটি ক্ষেত্র হলো নাগরিক সচেতনতা। উজ্জ্বল হোসাইন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ভূমি-সংক্রান্ত এসিজি গ্রুপের সাবেক সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন।
ভূমি, প্রশাসন ও নাগরিক সেবা সম্পর্কিত বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা তৈরি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাঁর সমাজকর্মী পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করেছে। এছাড়া তিনি চাঁদপুর পৌর কমিউনিটি পুলিশিং সমন্বয় কমিটির প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল দর্শন হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা।  তিনি সরাসরি ভোটে নির্বাচিত চাঁদপুর সাতিহ্য একাডেমির নির্বাহী সদস্য।
উজ্জ্বল হোসাইনের সৃজনশীল কাজের একটি বড় ক্ষেত্র হলো প্রকাশনা ও গ্রাফিক ডিজাইন। চাঁদপুর রোটারি ক্লাবের স্মরণিকা এবং চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের বার্ষিকী প্রতিবেদন প্রণয়ন ও ডিজাইনের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। এছাড়া সাবেক জেলা প্রশাসক আব্দুস সবুর মন্ডলের কর্মকালীন সময়ে, ২০১৫-২০১৮ সময়পর্বে তাঁর কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত প্রকাশনার গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করতে বার্ষিক প্রতিবেদন, স্মরণিকা ও প্রামাণ্য প্রকাশনার গুরুত্ব অপরিসীম। এ ধরনের কাজ শুধু নকশা বা মুদ্রণ নয়; এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, অর্জন ও কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হয়।
সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রযুক্তির পাশাপাশি উজ্জ্বল হোসাইন বর্তমানে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গভর্নেন্স ও পলিসি স্টাডিজে উচ্চশিক্ষা এবং এমফিল গবেষণায় তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁর পেশাগত জীবনের একটি নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
তাঁর শিক্ষাজীবনের বিস্তৃতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, বিজ্ঞান, আইন, কম্পিউটার, গণমাধ্যম এবং গভর্নেন্স—এই ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানক্ষেত্রের সমন্বয় তাঁর গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গিকে বহুমাত্রিক করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় নীতির সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ডিজিটাল গভর্নেন্স, অনলাইন সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রযুক্তি, নাগরিক অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা ও জনসেবার আধুনিকীকরণ—এসব বিষয়ে তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা গবেষণার জন্য বাস্তবভিত্তিক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
উজ্জ্বল হোসাইনের কর্মজীবনের দিকে সামগ্রিকভাবে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট তিনি একক পেশাগত পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন। রোটারি তাঁকে সেবামূলক নেতৃত্বের সুযোগ দিয়েছে; নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিয়েছে সৃজনশীলতার ক্ষেত্র; বিতর্কচর্চা দিয়েছে যুক্তিবাদী চিন্তার পরিসর; সাংবাদিকতা দিয়েছে সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরার সুযোগ; আর তথ্যপ্রযুক্তি দিয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিকে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের সক্ষমতা।
এই বহুমুখী অভিজ্ঞতার সমন্বয় তাঁকে একজন ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি’ বা বহুমাত্রিক পেশাজীবী হিসেবে চিহ্নিত করে।
ব্যক্তিগত জীবনে উজ্জ্বল হোসাইন বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী নাছরিন আক্তার চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে উদয়ন শিশু বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত।
দাম্পত্য জীবনে তাঁরা এক ছেলে ও এক মেয়ের অভিভাবক। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা তাঁর জীবনযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। উজ্জ্বল হোসাইনের জীবন ও কর্মকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে।
প্রথমত, তিনি শিক্ষাকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিজ্ঞান থেকে আইন, কম্পিউটার থেকে সাংবাদিকতা এবং পরবর্তীতে গভর্নেন্স ও পলিসি স্টাডিজ—এই যাত্রা তাঁর জ্ঞান অনুসন্ধানের বিস্তৃত মানসিকতার পরিচায়ক।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি ও সাংবাদিকতার সমন্বয় তাঁর পেশাগত পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ডিজিটাল যুগের সাংবাদিকতার জন্য এই দক্ষতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে তিনি ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।
চতুর্থত, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিতর্কচর্চা ও যুব সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে সমাজের তরুণ প্রজন্মকে সৃজনশীল ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিষয়েও তিনি আগ্রহী।
পঞ্চমত, গবেষণার সঙ্গে তাঁর বর্তমান সম্পৃক্ততা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে একাডেমিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
উজ্জ্বল হোসাইনের জীবনপথ মূলত একজন মানুষের বহুমুখী সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর গল্প। চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের একটি পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি শিক্ষা, সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রযুক্তি, আইন, গবেষণা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, রোটারি ও সামাজিক সংগঠনের নানা পরিসরে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
তাঁর কর্মপরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বরং সময়ের সঙ্গে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতার পরিসর বিস্তৃত করেছেন। একজন আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রযুক্তির সঙ্গে, সাংবাদিক হিসেবে মানুষের কথা বলার সঙ্গে, সংগঠক হিসেবে সমাজের সঙ্গে এবং গবেষক হিসেবে জ্ঞানচর্চার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
চাঁদপুরের মতো একটি জেলা শহরে থেকে বহুমাত্রিক পেশা ও সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই তিনি নিজের কর্মপরিসর তৈরি করেছেন।
ভবিষ্যতে তাঁর গবেষণা ও একাডেমিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হলে সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রযুক্তি ও গভর্নেন্সের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা বৃহত্তর জ্ঞানভাণ্ডারে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে তাঁর নেতৃত্ব তরুণ প্রজন্মকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একজন লেখক, সাংবাদিক, সংগঠক, গবেষক ও আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে উজ্জ্বল হোসাইনের পথচলা তাই কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিবরণ নয়; এটি চাঁদপুরের নাগরিক সমাজে একজন বহুমাত্রিক মানুষের দীর্ঘ সামাজিক সম্পৃক্ততারও দলিল। তাঁর নিজের ভাষায়, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষাই যদি এই পথচলার মূল প্রেরণা হয়ে থাকে, তবে আগামী দিনের কর্মযজ্ঞেও সেই সেবার ধারাবাহিকতা আরও বিস্তৃত হোক-এটাই তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা।

চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ
চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫

চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের শাহরাস্তি উপজেলার বানিয়াচোঁ এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবাহী ট্রাকের ভয়াবহ সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছে, এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে উপজেলার বানিয়াচোঁ পাটোয়ারী বাড়ির সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকাগামী আল-আরাফাহ পরিবহনের একটি বাস ও বিপরীত দিক থেকে আসা হাইড্রোলিক বালুবাহী ট্রাকের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ওভারটেক করার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। পরে আহতদের উদ্ধার করে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের আশঙ্কা, গুরুতর আহতদের মধ্যে আরও কেউ মারা যেতে পারেন। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে কিছু সময় যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
শাহরাস্তি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ওভারটেক করতে গিয়ে বাস ও ট্রাকের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং দুটিই সড়কের ওপর ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

৭১ ও ২৪-এর শহীদদের স্বপ্নপূরণে সবাইকে কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ
৭১ ও ২৪-এর শহীদদের স্বপ্নপূরণে সবাইকে কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।তিনি বলেছেন, ৭১ ও ২৪ -এ যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য লড়াই করা, যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে এবং সবাই শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে আয়োজিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ স্কাউটসের শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল দেশে একটি পরিবর্তন আনা। এমন একটি পরিবর্তন, যার মধ্য দিয়ে মানুষের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ অন্তত শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। শহীদদের আত্মত্যাগের ঋণ শোধ করার ক্ষমতা কারোর নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা শহীদ হয়েছেন, তারা একটি মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করতে গিয়ে তাদের জীবন দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে শুধু তাদের স্মরণ করলেই হবে না, তাদের মধ্যে থেকে আমারা যারা বেঁচে আছি,আমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে।’
বাংলাদেশ স্কাউটসদের সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের সবাইকে দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রাণ-প্রকৃতির পাশে থাকার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার পাশাপাশি অন্যদেরও এ কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ স্কাউটসের ১০ শহীদ পরিবারের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক ও সম্মাননা পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় বাংলাদেশ স্কাউটসের সভাপতি নাসিমুল গণি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের অবদান ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে জাতীয় পাঠ্যক্রমে তাদের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। অনুষ্ঠানে, শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ড.মাহাদী আমিনসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

১৬৬ কিমি মহাসড়কের বাঁকে ৭০ ‘মৃত্যুফাঁদ’

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ
১৬৬ কিমি মহাসড়কের বাঁকে ৭০ ‘মৃত্যুফাঁদ’

একটি বাঁক পেরোতেই সামনে আরেকটি বাঁক। কোথাও বাঁক এতটাই তীক্ষ্ণ যে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন শেষ মুহূর্তের আগে দেখা যায় না। কোথাও আবার সড়কের দুই পাশে গাছপালা, বাজার ও স্থাপনার কারণে দৃষ্টিসীমা আরও কম। এর মধ্যেই চলছে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাসসহ নানা ধরনের যানবাহন। ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতায় সামান্য ভুলেই ঘটছে মুখোমুখি সংঘর্ষ। কেউ ছিটকে পড়ছেন খাদে, কেউ চাপা পড়ছেন সড়কের পাশে। বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১৬৬ কিলোমিটার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে এমন বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে অন্তত ৫০টি। পরিবহন মালিক ও চালকদের হিসাবে সংখ্যাটি প্রায় ৭০। তাদের হিসাবে, এর মধ্যে অন্তত ৪০টি বাঁক দুর্ঘটনাপ্রবণ। বছরের পর বছর এসব বাঁকের অনেকগুলো একই অবস্থায় থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
স্থানীয় বাসচালক, পরিবহন মালিক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি শুধু চালকদের অসচেতনতার কারণে তৈরি হচ্ছে না। সরু সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, যানবাহনের বাড়তি চাপ, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো—সব মিলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলেছে। অথচ অবকাঠামোগত এসব ঝুঁকির অনেকগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
পদ্মা সেতুর পর বেড়েছে যানবাহনের চাপ
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালুর আগে ঢাকা–কুয়াকাটা মহাসড়কের বরিশালের ভূরঘাটা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১৬ থেকে ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করত। পদ্মা সেতু চালুর পর এ সংখ্যা বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের ছুটিতে যানবাহনের চাপ আরও বেড়ে যায়। অন্যদিকে, মহাসড়কের বড় একটি অংশ এখনও মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত দুই লেনের। ফলে পদ্মা সেতু পেরিয়ে দ্রুতগতিতে আসা যানবাহন তুলনামূলক সরু এই মহাসড়কে ঢোকার পর গতি নিয়ন্ত্রণ না করলে বাঁকগুলো বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়। বিশেষ করে মাদারীপুর থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত অংশে এ সমস্যা প্রকট বলে জানিয়েছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
যেসব বাঁকে বেশি ঝুঁকি
বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কের উজিরপুরের সানুহার, গৌরনদীর ভূরঘাটা ব্রিজ ও ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, কটকস্থল, পিঙ্গলাকাঠি, কসবা, বাবুগঞ্জের নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ, পাংশা, সাতমাইল, ছয়মাইল, বরিশাল সদরের গড়িয়ারপার, কাশিপুর, রেইন্ট্রিতলা, খয়রাবাদ ব্রিজের পরের অংশ, দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, বাকেরগঞ্জের লক্ষ্মীপাশা, বোয়ালিয়া, ভরপাশা, রেইন্ট্রিতলা, চরামদ্দি, আমতলীর শাখারিয়া ও ব্রিকস ফিল্ড এবং কলাপাড়ার মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেঁওড়াবুনিয়া এলাকায় একাধিক বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসচালক ও পরিবহন মালিকেরা।
তাদের ভাষ্য, এসব বাঁকের কয়েকটি এতটাই তীক্ষ্ণ যে বিপরীত দিকের যানবাহন সামনে না আসা পর্যন্ত চালকেরা তা দেখতে পান না। শীতকালে কুয়াশার কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন কোম্পানিগুলোর আগে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা। ফলে বাঁক এলাকাতেও অনেক চালক ওভারটেকের চেষ্টা করেন। বাসচালক মোহাম্মদ নয়ন বলেন, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ভূরঘাটা পর্যন্ত মহাসড়কে প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ থেকে ১৯টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পদ্মা সেতু চালুর পর এই সড়কে দ্রুতগতির যানবাহন বেড়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে এসব যানবাহন যখন ২৪ ফুট প্রশস্ত সড়কে ঢোকে, তখন একের পর এক বাঁকের কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ওপর রয়েছে বাস কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা। নিয়মিত এই রুটে গাড়ি চালানো চালকেরাও যখন দুর্ঘটনার শিকার হন, তখন নতুন চালকদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ভূরঘাটা থেকে নথুল্লাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৫৬ কিলোমিটার সড়কে ৪০ থেকে ৪২টি বাঁক রয়েছে। এসব বাঁকে বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়েছে অথবা বিপরীত দিকের যানবাহনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে।
পটুয়াখালী অংশেও ২০ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক
পটুয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাবে, লেবুখালী পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি স্থানে সতর্কতামূলক চিহ্নও দেওয়া হয়েছে। বাঁকগুলো সোজা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভাগটি। পটুয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জামিল আক্তার লিমন এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সোজা করার কাজ করা যাবে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাবের সঙ্গে একমত নন পরিবহন মালিকেরা। পটুয়াখালী জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ইমাম হোসেন নাসির বলেন, পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্তই প্রায় ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এ পথে দেড় শতাধিক আঞ্চলিক বাস চলাচল করে। বিশেষ করে শীতকালে কুয়াশার কারণে এসব বাঁকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বাঁকগুলো সোজা করার জন্য সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষকে বারবার বলা হয়েছে।
পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে নিহত ২,৩৮৭
অবকাঠামোগত ঝুঁকির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে দুর্ঘটনার সামগ্রিক পরিসংখ্যানও। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ২ হাজার ৩৮৭ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৫২৪টি দুর্ঘটনায় ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৪৩০টি দুর্ঘটনায় ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪৩৬টি দুর্ঘটনায় ৪১১ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৯টি দুর্ঘটনায় ৪৫৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪২১ জন নিহত হন।
অর্থাৎ পাঁচ বছরে নথিভুক্ত দুর্ঘটনায় বরিশাল বিভাগে গড়ে প্রতিদিন একাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে এই পরিসংখ্যান পুরো বরিশাল বিভাগের; শুধু বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কে নিহতের সংখ্যা নয়। এ মহাসড়কের পৃথক পাঁচ বছরের সমন্বিত মৃত্যুর তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, বরিশাল বিভাগের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় একটি অংশ বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের দুর্ঘটনার শিকার। পদ্মা সেতুর পর যানবাহনের গতি ও সংখ্যা দুটোই বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সড়কের সক্ষমতা বাড়েনি।
তিনি বলেন, ২৪ ফুট প্রশস্ত সরু সড়কে দ্রুতগতির বাসের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহনও চলছে। বাঁক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। চালকদের সচেতনতার পাশাপাশি পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন চালককে দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো থেকেও বিরত রাখতে হবে। ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালালে চালকের ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশস্ত হচ্ছে কিছু অংশ, বসানো হচ্ছে সতর্কতামূলক চিহ্ন
সড়ক ও জনপথ বিভাগ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কের বরিশাল অংশে ৩৬টি বাঁক চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁকের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ২৪ ফুট থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করা হয়েছে। কোথাও কাজ চলছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, ডানে-বাঁয়ে মোড়, ‘ধীরে চলুন’ ও নির্ধারিত গতিসীমার সতর্কতামূলক চিহ্ন বসানো হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও দুর্ঘটনা না কমার জন্য তিনি চালকদের অসচেতনতা ও অতিরিক্ত গতিকে দায়ী করেন।
চার ধরন বাদে সব মোটরযানের জন্য বিআরটিএর কড়া সতর্কবার্তা
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়কটি দুই লেনের এবং গড়ে ২৪ ফুট প্রশস্ত। পদ্মা সেতু চালুর পর এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। সরু সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেসব স্থানে সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে; কোথাও কোথাও কাজ চলছে। বাজার এলাকায় স্পিডব্রেকারসহ বিভিন্ন মোড়ে সতর্কতামূলক চিহ্নও দেওয়া হয়েছে। এরপরও দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমছে না। মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
চালকের ভুলেও বাড়ছে দুর্ঘটনা
বরিশাল বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক জিয়াউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২০২২ সালের একটি দুর্ঘটনার ঘটনায় বাকেরগঞ্জ থেকে যমুনা লাইন পরিবহনের এক চালককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। পরে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হয়। এ ধরনের ঘটনায় চালকের অসচেতনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করলে বিধি অনুযায়ী মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাস টার্মিনালগুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হয়।