খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

সাহিত্য-সংস্কৃতি এক ও অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ মে, ২০২৫, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
সাহিত্য-সংস্কৃতি এক ও অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই দুইয়ের সম্পর্ক এতটাই নিবিড় ও আন্তঃসম্পর্কিত যে, একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির অস্তিত্ব কল্পনা করাই কঠিন। সাহিত্য একটি সমাজের চিন্তা, চেতনা, অনুভব ও কল্পনার রূপান্তর যেখানে সংস্কৃতি হল সেই সমাজের জীবনধারা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও অভ্যাসের প্রতিফলন। এই প্রবন্ধে আমরা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, একে অপরকে প্রভাবিত করার রূপ, এবং সমাজে এদের অবদান বিশ্লেষণ করব।
সাহিত্য শব্দের অর্থ ‘সাহিত্যের সৃষ্টি’ যা ভাষার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। সাহিত্য কেবল কল্পনার ফসল নয়, এটি বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবিও বটে। সাহিত্য সমাজের দর্পণ। যা সময়ের পরিবর্তন, মানুষের ভাবনা, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে।
সংস্কৃতি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘কৃ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘গঠন করা’, ‘পরিশোধন করা’। সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনযাপনের ধারা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা, শিল্পকলা সব মিলিয়েই গঠিত হয় সংস্কৃতি। এটি সময়ের সঙ্গে রূপান্তরিত হলেও এর শিকড় থাকে অতীত অভিজ্ঞতায়।
সাহিত্য সংস্কৃতির অনুবাদক। সাহিত্য সংস্কৃতিকে চিত্রিত করে, বিশ্লেষণ করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা সঞ্চারিত করে। অন্যদিকে, সংস্কৃতি সাহিত্যের রসদ জোগায় তার বিষয়বস্তু, পটভূমি ও চরিত্রের মাধ্যমে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরকে পুষ্ট করে।
যেকোনো কালে রচিত সাহিত্য সেই সময়ের সংস্কৃতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও জীবনের প্রতিফলন। যেমন মঙ্গলকাব্য বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। এতে কৃষি নির্ভর সমাজের দেব-দেবী পূজার আচার, মানুষের বিশ্বাস ইত্যাদি প্রতিফলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর গান, কবিতা, উপন্যাসে সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক রূপ ফুটে উঠেছে। সাহিত্য রচনায় লেখক তার চারপাশের সংস্কৃতি থেকে উপাদান গ্রহণ করেন জীবনধারা, ভাষা, প্রবাদ-প্রবচন, লোক কাহিনি, পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি। এই উপাদানগুলো সাহিত্যকে সময়-প্রাসঙ্গিক করে তোলে।
সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ভাষা সাহিত্যের বাহক। ভিন্ন অঞ্চলের সাহিত্য তাদের স্বতন্ত্র ভাষা ও উপভাষার মাধ্যমেই এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক রঙ বহন করে। যেমন বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের সাহিত্য ঢাকার সাহিত্যের চেয়ে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে আলাদা।
ইতিহাসের ধারায় সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাহিত্য ও সংস্কৃতি কালের স্রোতে কিভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করেছে, তা ইতিহাসের পাতা ও সাহিত্যচর্চায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। পৌরাণিক কাহিনি, বেদ, মহাভারত ও রামায়ণ শুধু ধর্মীয় নয়, সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এসব গ্রন্থ ভারতীয় সংস্কৃতির শিকড় গেঁথে দিয়েছে। ভক্তি কাব্যধারার (চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, মীরাবাঈ) সাহিত্য সমাজে একটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনার সঞ্চার করেছে। ইসলামী রেনেসাঁ ও সুফি সাহিত্যে নতুন ধ্যান-ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে। বঙ্গ জবহধরংংধহপব-এর সময় সাহিত্য ও সংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি ব্যক্তিত্ব সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নতুন সমাজচিন্তা ও সংস্কৃতির জন্ম দেন।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক, সঞ্জীব, জীবনানন্দ, সুনীল, শঙ্খ ঘোষ থেকে শুরু করে হুমায়ুন আহমেদ ও সমকালীন লেখকগণ তাঁদের সাহিত্যে সমকালীন সংস্কৃতির বিবর্তন তুলে ধরেছেন। গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে সাহিত্যেও পরিবর্তন এসেছে—নতুন বিষয়, প্রযুক্তি, নগর-জীবনের টানাপোড়েন উঠে এসেছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি কেবল শিল্প বা রুচির বিষয় নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনেরও হাতিয়ার। এরা মানুষের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক চেতনা গঠনে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহিত্যে দেশপ্রেম, সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক প্রমুখ লেখকের সাহিত্য জনগণের চেতনাকে উজ্জীবিত করে।
সাহিত্যে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের চিত্রায়নের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখে। বিশ্বসাহিত্যে টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি কিংবা মার্কেজের রচনাগুলি মানবিক সংস্কৃতিকে উন্মোচন করে। একটি জাতির সাহিত্য তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করে, অন্যদিকে সংস্কৃতি তাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে। সাহিত্য সংস্কৃতির ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করে, যা একটি জাতিকে তার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নতুনভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ডিজিটাল যুগে সাহিত্য, ই-বুক, অডিওবুক, ব্লগ, সোস্যাল মিডিয়ায় সাহিত্য এখন সহজলভ্য। যদিও এই মাধ্যম সাহিত্যকে গণমুখী করছে, তবুও দ্রুততার যুগে গভীর পাঠের অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে, যা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য হুমকি।
বিশ্বায়নের ফলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আধিপত্য বাড়ছে, যার প্রভাবে স্থানীয় ভাষা, পোশাক, খাদ্য, রীতিনীতি প্রভৃতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাহিত্য এ বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ের রক্ষাকবচ হতে পারে। স্থানীয় সাহিত্যচর্চার প্রসার অঞ্চলভিত্তিক সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রসারে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ভাষার বিকাশে সাহিত্যচর্চা-সাহিত্যই ভাষাকে জীবিত রাখে। তাই মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা ও পাঠ উৎসাহিত করতে হবে।
নতুন মাধ্যমের সদ্ব্যবহার করতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে সাহিত্যকে ছড়িয়ে দিতে হবে। সাহিত্য ফেস্টিভ্যাল, অনলাইন ম্যাগাজিন, অডিওভিত্তিক সাহিত্যচর্চা আরও জনপ্রিয় করা যেতে পারে। ব্যাপক পরিসরে সাংস্কৃতিক সংলাপ করা যেতে পারে। ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সাহিত্য যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনি বহুত্ববাদী সমাজে সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে সাহিত্য ও সংস্কৃতি কেবল সময়ের সঙ্গে বদলায়নি বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে অভিযোজিত করেছে। এই অভিযোজন কখনো ভাষার রূপে, কখনো গল্প বলার ধরনে, কখনও কখনো সময়ের ব্যবধানে, কখনো বা বিষয়ের বিন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে। লোকসাহিত্য ছিলো মৌখিক সংস্কৃতির বাহক পল্লিগাথা, পালাগান, লোক কবিতা ইত্যাদিতে আমরা সংস্কৃতির জীবন্ত চিত্র পাই। যেমন-ভাটিয়ালি গান নদীমাতৃক বাংলার সংস্কৃতি ও পেশাজীবনের প্রতিচ্ছবি। পরবর্তীকালে এই মৌখিক ধারা লিখিত সাহিত্যে রূপান্তরিত হয়ে আধুনিক পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে। আধুনিক সাহিত্যে শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একদিকে গ্রামীণ সংস্কৃতির বিলুপ্তির ভয়, অন্যদিকে শহুরে জীবনযাত্রার জটিলতা—এই দুই বিপরীত সংস্কৃতি সাহিত্যে এক নতুন ধরনের দ্বন্দ্ব ও উপলব্ধি সৃষ্টি করেছে। যেমন-মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সংগ্রাম অসাধারণভাবে চিত্রিত হয়েছে। আবার সমরেশ মজুমদার বা সেলিনা হোসেনের রচনায় শহর-গ্রামের পারস্পরিক টানা-পোড়েন পাওয়া যায়। সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে নারীর অবস্থান ও তাঁর অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। নারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাহিত্যচর্চা এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক বোধ তৈরি করে। মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় আদিবাসী নারী ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংগ্রাম উঠে এসেছে। তসলিমা নাসরিন বা সেলিনা হোসেনের সাহিত্যে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম একটি সাহসী সংস্কৃতির উদাহরণ।
নারী যখন সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় হন, তখন তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও জীবনযাপন একটি নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর সৃষ্টি করে। বর্তমান সময়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রযুক্তির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ইন্টারনেট, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ইত্যাদি নতুন মাধ্যমগুলো সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিচ্ছে। আজকাল অনেকে ইনস্টাগ্রামে পোয়েট্রি ব্লগিং করছেন, যেখানে মেট্রোপলিটন জীবনের অনুভূতি, প্রেম, বিচ্ছেদ—সবই ছন্দবদ্ধভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। অনেক সাহিত্যিক ডিজিটাল নাটক বা স্ক্রিনপ্লের মাধ্যমে সমকালীন সংস্কৃতির টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলছেন। এটি প্রমাণ করে, সাহিত্যের রূপ বদলালেও তার মূল কাজ সংস্কৃতির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ঙহব ঐঁহফৎবফ ণবধৎং ড়ভ ঝড়ষরঃঁফব উপন্যাসে লাতিন আমেরিকার ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতি মিশে গিয়ে সাহিত্যকে মহাকাব্যে পরিণত করেছে। চিনুয়া আচেবের ঞযরহমং ঋধষষ অঢ়ধৎঃ আফ্রিকান সমাজ ও ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক সংঘাতকে চিত্রিত করেছে। হারুকি মুরাকামি তাঁর জাপানি সামাজিক বাস্তবতা ও সংস্কৃতি এক বিমূর্ত ও আধুনিক রূপে উপস্থাপন করেন। এসব সাহিত্যকর্ম প্রমাণ করে যে, সাহিত্য বিভিন্ন জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতি ধারণ করে রাখে এবং বিশ্বকে সেই জাতির অন্তর্জগতের সঙ্গে পরিচিত করায়। বয়সভিত্তিক শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চায় সংস্কৃতির বীজ রোপণ করা জরুরি।
শিশু-কিশোর সাহিত্য তাদের ভেতরে নৈতিকতা, সহানুভূতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে সাহায্য করে। গল্পের মাধ্যমে শিশুরা দেশের ইতিহাস, লোক কাহিনি, মহান ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে জানতে পারে। নাটক, কবিতা আবৃত্তি, বইপড়া প্রতিযোগিতা ইত্যাদির মাধ্যমে তারা সাহিত্যিক রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিশীলন লাভ করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে নিজের শেকড় ভুলে না যায়, তার জন্য স্কুল-কলেজে সাহিত্য ও সংস্কৃতির কার্যকর মেলবন্ধন অপরিহার্য।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিএই দুই একে অপরের অবিচ্ছেদ্য আত্মা ও শরীর। সাহিত্য সংস্কৃতির ভাষ্যকার, আবার সংস্কৃতি সাহিত্যের প্রাণরস। একটি জাতির জীবনচর্চা, স্বপ্ন, সংকট, সংগ্রাম, সৃষ্টিশীলতা ও আত্মপরিচয়—সব কিছুই এই দুইয়ের মধ্যে সংরক্ষিত থাকে। আজকের দিনে যখন প্রযুক্তি, বৈশ্বিক চাপ এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে, তখন সাহিত্য-সংস্কৃতির শক্তি আমাদের আত্মপরিচয়ের রক্ষাকবচ হতে পারে। এই যুগে প্রয়োজন এমন সাহিত্যচর্চা যা আমাদের সংস্কৃতির গভীরতা বজায় রেখে আধুনিক বাস্তবতাকে গ্রহণ করে। কারণ সাহিত্য যদি হৃদয়ের ভাষা হয়, তবে সংস্কৃতি সেই হৃদয়ের ছন্দ। তাই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বলাই যায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি শুধু এক ও অবিচ্ছেদ্য নয়, বরং তারা একটি জাতির অস্তিত্বের মৌলিক শিকড়।
প্রবাসী লেখকের সাহিত্যেও সংস্কৃতির চিহ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে বাস করেও তাঁরা তাঁদের শিকড়, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয় খুঁজে ফেরেন সাহিত্যের মাধ্যমে। ঝরনা ধারা চৌধুরী, তাহমিনা আনাম বা ঝুম্পা লাহিড়ীর মতো প্রবাসী লেখকেরা তাঁদের লেখায় পশ্চিমা বাস্তবতার মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির টানাপোড়েনকে তুলে ধরেন। ঞযব ঘধসবংধশব উপন্যাসে ঝুম্পা লাহিড়ী দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসীদের পরিচয় সংকট ও সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি তুলে ধরেন যা অভিবাসী জীবনের বাস্তব চিত্র। এই সাহিত্যগুলো বৈশ্বিক পাঠকের কাছে একটি জাতির সংস্কৃতিকে তুলে ধরার সেতু তৈরি করে, এবং একই সঙ্গে বিশ্বায়নের যুগে ব্যক্তিগত সংস্কৃতি রক্ষার সংকটকেও উন্মোচন করে।
লোকসংস্কৃতি মূলত সাধারণ মানুষের জীবনের সৃজনশীল প্রকাশ। এই সংস্কৃতি সাহিত্যে প্রবাহিত হয়ে এসে কেবল রচনা নয়, জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতির সংরক্ষক হিসেবেও কাজ করে। নকশিকাঁথার মাঠ (জসীমউদ্দীন) একটি কবিতা হলেও এতে গ্রামীণ নারীর জীবন তার বেদনা ও শিল্পচর্চার চমৎকার সাংস্কৃতিক রূপায়ণ রয়েছে। মৌলভীবাজারের পুথি সাহিত্য বা সিলেট অঞ্চলের গীতি সবই লোকসংস্কৃতিকে সাহিত্যের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছে। সাহিত্য যদি সমাজের চেতনাকে ধারণ করে, তাহলে লোকসাহিত্য হল সেই চেতনার প্রাণভাষা। ধর্মও একটি সাংস্কৃতিক কাঠামো এবং সাহিত্য বহু সময়েই ধর্মীয় মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান বা ধর্মীয় সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজকে ব্যাখ্যা করেছে। লালন ফকিরের গান আধ্যাত্মিকতা, মানবধর্ম, অসাম্প্রদায়িক ভাবনা এবং বাউল সংস্কৃতিকে সাহিত্যের স্তরে নিয়ে গেছে। রুমির কবিতা বা হাফিজের গজল এসব ইসলামী সংস্কৃতির গহীন দিক তুলে ধরেছে যা বিশ্বসাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করে। এ ধরনের সাহিত্য মানুষের আত্মা ও সংস্কৃতির মধ্যকার সংযোগের প্রতিচ্ছবি। বর্তমান সময়ে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সাহিত্যে সংস্কৃতির নতুন দিক উঠে এসেছে। যাকে বলা হয় ইকোলজিকাল লিটারেচার বা পরিবেশ-সাহিত্য। হেলেন কেনেডি, আরুন্ধতী রায় বা বাংলা সাহিত্যে হাসান আজিজুল হকের লেখায় পরিবেশ সংক্রান্ত সচেতনতা দেখা যায়। নদী, পাহাড়, বন এসব কেবল প্রাকৃতিক উপাদান নয় বরং একটি সংস্কৃতিরও অংশ। সাহিত্য সেই সংযোগকে সামনে আনে। প্রকৃতি-সংস্কৃতি-সাহিত্যের এই ত্রিভুজ সম্পর্ক সমকালীন সাহিত্যের একটি নতুন মাত্রা। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং একটি সংস্কৃতির মৌলিক ভিত্তি। সাহিত্য সে ভাষাকে জীবন্ত রাখে এবং সংস্কৃতির বাহক হিসেবে কাজ করে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একদিকে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের সংগ্রাম, অপরদিকে সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত সাহিত্যে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কবিতা, গল্প, নাটকে। সাহিত্য যদি মাতৃভাষায় রচিত না হয়, তবে একটি জাতির সংস্কৃতি ও চেতনা বিকশিত হতে পারে না। সাহিত্যিক ভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির পরিবর্তনও ধরা পড়ে। বর্তমান যুগে সাহিত্য ও সংস্কৃতি নানা সংকটে নিমজ্জিত। তবে সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনা নিহিত থাকে। জনপ্রিয়তাকেন্দ্রিক সাহিত্য (ঢ়ড়ঢ় ষরঃবৎধঃঁৎব) অনেক সময় গভীরতা হারাচ্ছে। টিভি, ওয়েব সিরিজ ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে সাহিত্যের পাঠক সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বাস্তবধর্মী সাহিত্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি যথাযথভাবে উঠে না আসার অভিযোগও রয়েছে। সাহিত্য আজ অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক। নারী, লিঙ্গ-সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সাহিত্যচর্চায় সম্পৃক্ত হচ্ছেন। অনলাইন সাহিত্যের বিকাশ নতুন লেখকদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। সাহিত্য এখন আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে উদযাপন করছে। বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক সাফল্য একদিকে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে বিশ্বের কাছে বাংলা সংস্কৃতিকে পৌঁছে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করে। তাহমিনা আনাম, জয়া মিত্র, মোমিনুল আজহার মতো লেখকের ইংরেজিতে রচিত সাহিত্য বাংলা সংস্কৃতির বহির্বিশ্বে সেতুবন্ধ তৈরি করছে। সাহিত্যই সেই মাধ্যম যার মাধ্যমে একটি জাতির সংস্কৃতি ভৌগোলিক সীমার বাইরে বিস্তৃত হতে পারে।
একটি জাতির অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্য নির্ভর করে তার সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর। সাহিত্য কেবল মুদ্রিত কিছু শব্দ নয়, বরং একটি সময়ের মনোভঙ্গি, সংস্কৃতির বহমানতা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। সংস্কৃতি কেবল রীতি-নীতি নয়, বরং তা জীবনের রং, ছন্দ ও দর্শন। এই দুইয়ের পারস্পরিক নির্ভরতা এবং শক্তিশালী বন্ধন মানবসভ্যতাকে করে তুলেছে সৃষ্টিশীল, সংবেদনশীল ও সচেতন। সাহিত্য ও সংস্কৃতি এই দুই ধারাই আমাদের ইতিহাস, আত্মমর্যাদা ও মানবিক মূল্যবোধের বাহক। এদের বিকাশ ও সংরক্ষণ কেবল নীতিগত দায়িত্ব নয় বরং জাতিগত দায়িত্বও বটে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক, সমান্তরাল ও অবিচ্ছেদ্য। সাহিত্যই সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে, আর সংস্কৃতিই সাহিত্যের প্রাণ জোগায়। মানবজীবনের গভীরতম অনুভূতি, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও বোধ এই দুইয়ের সমন্বয়ে ফুটে ওঠে। ভবিষ্যতের সমাজ ও প্রজন্মকে পথ দেখাতে হলে সাহিত্য-সংস্কৃতির এই বন্ধনকে আরও মজবুত করতে হবে—তবে শুধুই রক্ষণশীল নয়, বরং সৃজনশীলতা, উদারতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে। কারণ সাহিত্য-সংস্কৃতিই একটি জাতিকে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, অমর করে রাখতে পারে তার আত্মপরিচয়।
লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, প্রাবন্ধিক, চাঁদপুর।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।