খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১ মাঘ, ১৪৩২

বয়সের আগুনে পুড়ছে অবশিষ্ট ভালোবাসা

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
বয়সের আগুনে পুড়ছে অবশিষ্ট ভালোবাসা

ভালোবাসা মানুষের জীবনকে গঠন করে তাকে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়। কখনো সুখের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার কখনো গভীর দুঃখের অতলে ডুবিয়ে দেয়। তবে সময়ের সঙ্গে ভালোবাসার রূপ বদলায়। কোনো সম্পর্কই একই রকম থাকে না। ভালোবাসা যেমন ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, তেমনি কখনো কখনো তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ধ্বংস হয়, আর তার অবশিষ্ট আগুন জ্বলতে জ্বলতে একসময় নিভে যায়। ভালোবাসা মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুভূতি, যা কখনো আনন্দ দেয়, কখনো কষ্টের গভীরে নিয়ে যায়। সম্পর্কের সূচনা যেমন আবেগময় হয়, তেমনি সময়ের সাথে সাথে তা পরিবর্তিত হয়, বিবর্ণ হতে থাকে, কখনো হারিয়ে যায়, কখনো বা অবশিষ্ট আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে। আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই আগুন কখনো পুরোপুরি নিভে যায়, আবার কখনো তার ছাই থেকে নতুন অনুভূতির জন্ম হয়।
আমাদের জীবনেও হয়তো সেই অবশিষ্ট আগুন এখনও ধিকিধিকি জ্বলছে, পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতিতে, ভুল বোঝাবুঝির যন্ত্রণায় বা অতীতের কোনো অনুভূতির ছায়ায়। কিছু ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না, বরং তার রেশ থেকে যায় আমাদের মানসিকতার গভীরে, আচরণে, এবং পরবর্তী সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে।
ভালোবাসা কখনোই একদিনে জন্ম নেয় না, এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, একটি মানুষের অন্তরের গভীরে স্থান করে নেয়। প্রথম প্রেম, প্রথম স্পর্শ, প্রথম অভিজ্ঞতা—সবই মনের গভীরে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। তবে সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের মাঝে ক্লান্তি আসে, ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, বিশ্বাস ভেঙে পড়ে, এবং কখনো কখনো সম্পর্কের পরিণতি হয় বিচ্ছেদে। অনেক সময় সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও তার রেশ থেকে যায়, হয়তো কোনো গানের লিরিকে, কোনো চেনা গলির মোড়ে, পুরোনো দিনের চিঠিতে বা কিছু ছবির ভাঁজে। সেই অনুভূতির অবশিষ্টাংশ আমাদের মনে বারবার ফিরে আসে, স্মৃতির মতো, কখনো আনন্দদায়ক, কখনো বেদনাদায়ক।
যখন কোনো সম্পর্ক ভেঙে যায়, তার মানে এই নয় যে ভালোবাসা একেবারে মুছে যায়। বরং সম্পর্কের শেষ মুহূর্তগুলোর স্মৃতি, যন্ত্রণা, হতাশা, এবং অভিমান আমাদের মধ্যে বাস করতে থাকে।
কিছু সম্পর্কের অবশিষ্ট আগুন সুখের স্মৃতি হিসেবে থাকে, যা মাঝে মাঝে মনে পড়ে আনন্দ এনে দেয়। আবার কিছু সম্পর্কের অবশিষ্ট আগুন জ্বলতে জ্বলতে কষ্টের এক বিশাল প্রাচীর তৈরি করে, যা আমাদের নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে বাধা দেয়। আমরা হয়তো বারবার ফিরে যেতে চাই পুরোনো সেই মুহূর্তগুলোর কাছে, কিন্তু বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সে সময় আর ফিরে আসবে না।
যৌবনের ভালোবাসা আবেগে ভরা থাকে, সেখানে যুক্তির চেয়ে অনুভূতি বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে, আমাদের ভালোবাসার ধরনও বদলে যায়। যে আবেগ একসময় বন্য ঝড়ের মতো ছিল, তা ধীরে ধীরে শান্ত নদীর মতো হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সাথে আমরা বুঝতে পারি, ভালোবাসা মানে শুধু আবেগের জয়গান নয়; বরং এটি দায়িত্ব, বিশ্বাস, এবং বোঝাপড়ার সমষ্টি। যখন কোনো সম্পর্কের মধ্যে এই উপাদানগুলো হারিয়ে যেতে থাকে, তখন ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন ধীরে ধীরে নিভে যায়।
আধুনিক যুগে ভালোবাসার সংজ্ঞা এবং এর প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় ভালোবাসা মানে ছিল সারাজীবন একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসার জন্য লড়াই করা, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা। কিন্তু বর্তমান সমাজে ভালোবাসার স্থায়ীত্ব কমে যাচ্ছে, সম্পর্কগুলো দ্রুত গড়ে ওঠে এবং দ্রুত ভেঙে যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রযুক্তির উন্নতি, এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করার ফলে ভালোবাসার রূপান্তর হচ্ছে। আমাদের সম্পর্কগুলো এখন অনেকটাই তাৎক্ষণিক, যেখানে গভীরতা কম কিন্তু অভিজ্ঞতা বেশি। ফলে ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন আমাদের জীবন থেকে দ্রুত নিভে যায়, স্মৃতিগুলো মুছে যায়, এবং নতুন বাস্তবতা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়।
যে আগুন একসময় আমাদের পুড়িয়েছিল, তা হয়তো আমাদের আরও পরিপক্ক করেছে। একবার ভালোবাসায় পোড়ার পর মানুষ আরও সতর্ক হয়ে যায়, সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশি সচেতন হয়ে ওঠে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ভালোবাসা আর আসবে না। বরং, পুরোনো আগুনের ছাই থেকে নতুন ভালোবাসার ফুল ফোটে। কেউ কেউ পুরোনো ক্ষত থেকে শিখে নতুন করে জীবন শুরু করে, আবার কেউ হয়তো সেই স্মৃতির আগুনেই সারাজীবন পুড়ে যেতে থাকে।
ভালোবাসা প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তের সাথে যুক্ত হয়—প্রথম দেখা, প্রথম কথা, প্রথম ছোঁয়া, প্রথম অনুভূতি। এটি আমাদের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে, একধরনের স্বপ্ন তৈরি করে, যেখানে একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসার আবেগ এবং একে অপরকে ধরে রাখার ইচ্ছে কাজ করে।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের ধরন বদলায়। জীবনের বাস্তবতা, পারস্পরিক দূরত্ব, মানসিক পরিবর্তন এবং পরিস্থিতির চাপে সম্পর্কের গভীরতা কমতে থাকে। যখন সম্পর্কের উত্তাপ কমে আসে, তখন ভালোবাসার অবশিষ্ট অংশটুকু টিকে থাকে স্মৃতির আকারে। সেই স্মৃতির আগুন হয়তো আমাদের মনে কষ্ট দেয়, কিন্তু সেটাই আমাদের ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কিছু কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবন থেকে চলে গেলেও তার ছাপ মুছে যায় না। কিছু মুহূর্ত আমাদের মনে থেকে যায়, কোনো গানের সুরে, পুরোনো এক খামে লুকানো চিঠিতে, অথবা কোনো বিশেষ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার সময়। এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে একধরনের অদৃশ্য অনুভূতি তৈরি করে, যা সুখ বা দুঃখের রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, বাস্তবতা আমাদের শেখায় যে অতীতকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। আমরা যতই পুরোনো অনুভূতিতে বেঁচে থাকতে চাই, জীবন আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বাধ্য করে। ফলে ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন ক্রমশ নিভে আসে, কিন্তু তার তাপ আমাদের মনে দীর্ঘস্থায়ীভাবে থেকে যায়। যৌবনের ভালোবাসা আবেগপ্রবণ ও বেপরোয়া হতে পারে, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমরা বুঝতে পারি ভালোবাসা কেবল আবেগের উপর নির্ভরশীল নয়। এটি দায়িত্ব, আত্মত্যাগ, বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে।
যখন আমরা তরুণ থাকি, তখন ভালোবাসাকে শুধুমাত্র আবেগ ও রোমাঞ্চের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। কিন্তু সময়ের সাথে বাস্তবতা আমাদের শেখায় যে শুধুমাত্র আবেগ টিকিয়ে রাখা যথেষ্ট নয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন বোঝাপড়া, ধৈর্য এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ। অনেক সম্পর্ক শুধু আবেগের কারণে টেকে না, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস ও মানসিক পরিপক্বতার কারণে দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিছু সম্পর্ক একসময় শেষ হয়ে যায়, এবং তখন ভালোবাসার অবশিষ্ট অংশটুকু আমাদের মনকে দ্বিধায় ফেলে। আমরা কি সেই পুরোনো মুহূর্তগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকব, নাকি নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাব?
অনেকে ভালোবাসার অতীত স্মৃতিকে মনে ধরে রাখে, কারণ তারা বিশ্বাস করে সেই অনুভূতির আর কোনো বিকল্প নেই। আবার কেউ কেউ মনে করে, পুরোনো অনুভূতিকে স্মৃতির পাতায় রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।
এই দ্বন্দ্ব মানুষের ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে। কেউ হয়তো আগের সম্পর্কের স্মৃতিকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে চায়, আবার কেউ সেই স্মৃতিকে সঙ্গী করেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়। যে আগুন একসময় আমাদের পুড়িয়েছে, সেটাই হয়তো আমাদের নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে। ভালোবাসার অভিজ্ঞতা, কষ্ট, এবং বিচ্ছেদ আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলে, আমাদের আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
বিচ্ছেদের পর মানুষ দুটি পথে হাঁটে- কেউ পুরোনো অনুভূতিতে আটকে থাকে, নতুন ভালোবাসার পথে আর পা বাড়ায় না। কেউ পুরোনো স্মৃতিকে জীবনের অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করে, এবং নতুন করে জীবন শুরু করে।
কিছু মানুষ একা থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, আবার কেউ নতুন সম্পর্ক তৈরি করে, যেখানে তারা অতীত থেকে শেখা জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
আজকের ডিজিটাল যুগে ভালোবাসার সংজ্ঞা ও প্রকাশভঙ্গি আগের চেয়ে অনেক বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, দ্রুতগতির জীবনযাত্রা, এবং সম্পর্কের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ভালোবাসাকে আরও ক্ষণস্থায়ী করে তুলেছে।
আগের দিনে সম্পর্কগুলো ধৈর্য, ত্যাগ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে গড়ে উঠত, কিন্তু বর্তমান সময়ে সম্পর্ক দ্রুত গড়ে ওঠে এবং দ্রুত ভেঙেও যায়। ফলে ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন জ্বলে ওঠার সুযোগই পায় না; বরং মানুষ নতুন সম্পর্কে ঢুকে পড়ে পুরোনো ক্ষতকে ভুলে থাকার জন্য। কিন্তু এর ফলে অনেক মানুষই একাকীত্ব অনুভব করে, কারণ তারা সত্যিকারের ভালোবাসার গভীরতা থেকে বঞ্চিত হয়।
আমরা যদি ভালোবাসার অবশিষ্ট অংশটুকুকে কেবল যন্ত্রণা হিসেবে দেখি, তাহলে সেটি আমাদের মনকে আরও ভারাক্রান্ত করবে। কিন্তু যদি এটিকে জীবন শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে আমরা ব্যক্তিগতভাবে আরও পরিণত হতে পারব। আমরা ভালোবাসতে পেরেছিলাম, সেটাই এক বড় ব্যাপার। ভালোবাসার অনুভূতি হারিয়ে গেলেও, সেটি আমাদের জীবনকে রঙিন করেছিল। নতুন সম্পর্কের পথে হাঁটার আগে পুরোনো সম্পর্কের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
অতএব, ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন শুধুমাত্র কষ্টের প্রতীক নয়, এটি আমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা, যা আমাদের আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না, বরং এটি সময়ের সাথে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে। আমাদের জীবন, সম্পর্ক, এবং সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই আগুন কখনো জ্বলে ওঠে, কখনো নিভে যায়।
যদি আমরা পুরোনো ভালোবাসার ছায়ায় আটকে থাকি, তাহলে নতুন ভালোবাসা আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি আমরা সেই অবশিষ্ট আগুনকে অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে তা আমাদের ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করতে পারে। ভালোবাসা শেষ হতে পারে, কিন্তু তার শিক্ষা, তার স্মৃতি আমাদের জীবনকে নতুনভাবে গড়তে সাহায্য করে। শেষ পর্যন্ত, আমাদের জীবন ভালোবাসারই গল্প—কখনো তা আনন্দে ভরা, কখনো বেদনার আগুনে পোড়া। কিন্তু সেই আগুন থেকেই আমরা নতুন আলো খুঁজি, নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যাই।
ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না, বরং এটি আমাদের হৃদয়ে এক ধরনের আলো হয়ে থাকে। কিছু স্মৃতি আমাদের কষ্ট দেয়, কিছু আমাদের হাসায়, কিছু আমাদের নতুন করে জীবন শুরু করতে অনুপ্রাণিত করে।
যদি আমরা পুরোনো ক্ষত নিয়ে বাঁচতে চাই, তাহলে সেই আগুন আমাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলবে। কিন্তু যদি আমরা সেই আগুনকে অভিজ্ঞতার আলো হিসেবে দেখি, তাহলে তা আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেবে।
ভালোবাসা শেষ হতে পারে, সম্পর্কের পরিণতি যা-ই হোক, কিন্তু ভালোবাসার চিহ্ন থেকে যায়—আমাদের অনুভূতিতে, স্মৃতিতে, এবং জীবনের সিদ্ধান্তে। তাই ভালোবাসার অবশিষ্ট আগুন শুধু পোড়ায় না, কখনো কখনো এটি আমাদের নতুন আলোও দেখায়।
লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, সাংবাদিক প্রাবন্ধিক, চাঁদপুর।

কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ
কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

কুড়িগ্রামে শীত ও ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারদিক। গত কয়েক দিন থেকে আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও নেই উত্তাপ।হাসপাতাল গুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সোমবার (১২জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এদিকে কুয়াশা ও শীতের তীব্রতার সঙ্গে উত্তরীয় হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। হাসপাতালে আসা চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের জোড়গাছ এলাকার খলিল মিয়া বলেন, আমার ছেলের কয়েক দিন থেকে ডায়েরি তাই ভর্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পৌর শহরের কলেজ পাড়া এলাকার হোটেল শ্রমিক জাহিদ মিয়া বলেন, সকাল বেলা ঠান্ডা ও শীতে বাড়িত থাকি বের হওয়া যায় না। কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়, দুস্থ মানুষদের মধ্যে কম্বল বিতরণ চলমান রয়েছে। রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, সোমবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই জারি করা হয়েছে এ সতর্কতা। ইসরায়েলের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মধ্যে টেলিফোনে বৈঠক হয়েছে। মূলত ইরান পরিস্থিতিই ছিল সেই ফোনালাপের একমাত্র বিষয়বস্তু। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে নেতানিয়াহু-রুবিওর আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে রুবিওর সঙ্গে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগের দিন শুক্রবার মার্কিন দৈনিক দ্য ইকোনমিস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে ইরান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, “আমার মনে হয় কোনো ধারণাগত মন্তব্য না করে আমাদের উচিত হবে ইরানে কী ঘটছে, তা দেখা। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলন বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ। এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার এবং গতকাল শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিযাত শাখা ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে নামানো হয়েছে। শনিবার রাতে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি।
তবে ইরানের চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুন মাসে ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। টানা ১২ দিন সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল সেবার।

লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

রায়পুরসহ লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের অভিযান থাকলেও ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় থামছে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৫টায় রায়পুর শহরের প্রধান সড়কে তিনটি ও সদরের দক্ষিণ বাজারের গোডাউন এলাকায় ৪টি অভিযানে সাতটি মামলায় মোট দশ ডিলারকে ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।পৃথক এই অভিযান পরিচালনা করেন রায়পুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন ও নিরুপম মজুমদার। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্যে সরকারি দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। গৃহিণী আফসানা বলেন, ‘টিভিতে দামের ঘোষণা শুনি, কিন্তু দোকানে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না।’ ক্রেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়ে হলেও সহজে গ্যাস পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।’ খুশবু আক্তার বলেন, ‘তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নিতে বাধ্য করছে।’
পরিবেশক মোহাম্মদ কাজল ও ফাহিম বলেন, ‘গোডাউনে চাহিদার চেয়ে মাল কম। কোম্পানি থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বাজারে দাম বাড়ানো বাধ্যতামূলক।’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামসুল বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে।’ রায়পুর উপজেলা পরিষদের সামনে পিঠা বিক্রেতা আরিফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দৈনিক দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে।’
ওমেরা ও যমুনা এলপিজির পরিবেশক বেলাল হোসেন বলেন, ‘ওমেরা ও যমুনা কোম্পানির কোনও সংকট নেই। পাইকারি দামে ১৩৮০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি দামের চেয়ে বেশি কেনা হচ্ছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর শহরের ৭ জনকে ৪২ হাজার ও রায়পুর শহরের ৩ জন ব্যাবসায়ীকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নিই। অভিযোগ পেলে জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, না হলে সিন্ডিকেট ভাঙ্গা কঠিন হবে।’
রায়পুর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লুধুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এলপিজি বাজারের অনিয়ম উদ্বেগজনক। সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি ও ভোক্তাদের সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। না হলে নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।’
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাছান বলেন, লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ও সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এলপিজি-এর সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কালে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে সদরে ৭টি মামলায় ৪২ হাজার টাকা এবং রায়পুরে তিন মামলায় ১১ হাজার টাকা অর্থদন্ড আদায় করা হয়েছে। জনস্বার্থে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রুখতে জেলা প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি ও অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।