খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

নানা সংকটে চাঁদপুরের ইলিশ এখন বিলাসবহুল খাবার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫, ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ
নানা সংকটে চাঁদপুরের ইলিশ এখন বিলাসবহুল খাবার

ইলিশ—বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, যার সঙ্গে বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর ইলিশের রাজধানী হিসেবে খ্যাত চাঁদপুর, যেখানে পদ্মা-মেঘনার মোহনায় জন্ম নেয় রুপালি জলের রানী।  চাঁদপুরের মানুষের জীবনে ইলিশ শুধু মাছ নয়, এটি জীবিকা, গর্ব, ঐতিহ্য এবং উৎসবের নাম।  কিন্তু আজ সেই ইলিশই হয়ে উঠছে দুষ্প্রাপ্য, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।  দাম, প্রাপ্তি এবং নিয়ন্ত্রণে নানা সংকটের কারণে চাঁদপুরে ইলিশ এখন একরকম বিলাসবহুল খাবারে পরিণত হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা ইলিশ সংকটের পেছনের কারণ, প্রভাব এবং সম্ভাব্য সমাধান বিশ্লেষণ করব।
ইলিশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও চাঁদপুরের গুরুত্ব ।অনেক যা অনেক আগে থেকে। ইলিশ বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহে জন্মানো একটি স্বাদু পানির মাছ হলেও এটি সমুদ্রেও বিচরণ করে। প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমে হাজার হাজার ইলিশ প্রজননের জন্য নদীতে ফিরে আসে।  চাঁদপুর জেলা পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনার অবস্থান হওয়ায় এখানেই সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। “চাঁদপুরের ইলিশ” নামেই সারাদেশে এই মাছ সুপরিচিত। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে চাঁদপুরের হাট-বাজার ছিল ইলিশে সয়লাব।  দাম ছিল তুলনামূলক কম।  সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষও সহজে কিনে খেতে পারত।  কিন্তু এখন সে চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।
ইলিশ ধরা মৌসুমভিত্তিক এবং বয়সভিত্তিক হওয়া উচিত হলেও অনেক সময় মাছের প্রজনন মৌসুমেও মাছ ধরা হয়। জাটকা নিধন, অর্থাৎ ছোট ইলিশ ধরা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এতে ভবিষ্যতের ইলিশ উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ে। পদ্মা ও মেঘনাসহ দেশের বড় নদীগুলোর পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। শিল্পকারখানা থেকে নিঃসৃত বর্জ্য, কীটনাশকের ব্যবহার এবং নদীর তীরে অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে ইলিশের প্রজননের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে অত্যাধুনিক ফাইন জাল ব্যবহার করা হয় যা ছোট মাছসহ সব ধরণের মাছ ধ্বংস করে দেয়। বড় নৌকার মালিকরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফেলেন, ফলে নদীতে মাছের প্রবেশ কমে যায়। চাঁদপুরের বহু জেলে পরিবার সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে ৬৫ দিনের মাছ ধরার মৌসুমে বিরত থাকেন। কিন্তু এই সময় তারা পর্যাপ্ত সহযোগিতা পান না। ফলে তাদের জীবিকা সংকটে পড়ে এবং অনেক সময় নিরুপায় হয়ে নিয়ম ভেঙে মাছ ধরতে বাধ্য হন। বাজারে ইলিশের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিন্ডিকেটরা দাম বাড়িয়ে দেয়। একটি কিলো ইলিশের দাম অনেক সময় দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের কেনা সম্ভব হয় না।
ইলিশের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছের বাজারে অন্য মাছের দামও বেড়ে যায়।  ফলে পুরো বাজার ব্যবস্থায় চাপ পড়ে এবং ভোক্তারা ভোগান্তির শিকার হন। ইলিশ বাঙালি সংস্কৃতির অংশ।  পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা, ঈদ কিংবা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ইলিশের ব্যবহার ঐতিহ্যবাহী। ইলিশের অভাবে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। যেসব পরিবার ইলিশ আহরণের ওপর নির্ভরশীল, তারা মাছ না পেয়ে ভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।  কেউ কেউ শহরে এসে রিকশা চালান, আবার কেউ দিনমজুরের কাজ করেন।  চাঁদপুরের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হলো “ইলিশ ভোজন”।  দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে মোলহেডে এসে ইলিশ খেতেন।  এখন ইলিশের দাম ও প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
চাঁদপুরবাসী এখন কষ্ট পায় যখন শুনে, চাঁদপুরের মানুষই ইলিশ খেতে পায় না! স্থানীয় একজন গৃহিণী জানান, আগে প্রতি সপ্তাহে একবার ইলিশ রান্না করতাম, এখন ঈদ ছাড়া খাওয়াই হয় না।
একজন প্রবীণ জেলে বলেন, জীবনটা কাটাইলাম নদীতে, এখন নদীই আমাদের কিছু দেয় না। খালি পুলিশ-নিষেধ আর হুমকি। এমন অনেক গল্প রয়েছে যা বোঝায় চাঁদপুরবাসী কিভাবে নিজেদের ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে জাটকা রক্ষা এবং প্রজনন মৌসুমে নজরদারি বাড়াতে হবে। মাছ ধরা নিষিদ্ধ মৌসুমে জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে—যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, কিংবা নৌ-ভ্রমণ খাত। এতে তাদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে। নদী দূষণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নদীর তীরে অবৈধ দখল ও শিল্প বর্জ্য নির্গমন বন্ধ করতে হবে। ইলিশের অভয়াশ্রম সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। ইলিশ বাজারে সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। অনলাইন বাজার ব্যবস্থা উন্নত করলে মধ্যস্বত্বভোগী কমে যাবে।
চাঁদপুর—বাংলাদেশের ইলিশরাজ্য হিসেবে সুপরিচিত। এখানকার পদ্মা-মেঘনার মোহনা শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর লাখো কেজি ইলিশ আহরণ হয় এখান থেকে, যার একটি বড় অংশ চলে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চাঁদপুরে ইলিশের বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা সংকট, অসঙ্গতি ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছঘাট, পুরানবাজার, রাজরাজেশ্বর, হাইমচর, মতলব উত্তর ও দক্ষিণসহ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ইলিশ বাজার গড়ে উঠেছে। এখানে মাছ বিক্রেতা, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সমন্বয়ে একটি বিশাল বাণিজ্যিক চক্র গড়ে উঠেছে। মাছ ধরা থেকে বিক্রি পর্যন্ত এই বাজার ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত রয়েছে হাজারো মানুষ।
তবে দুঃখজনকভাবে, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাব প্রকট। প্রতি বছর ইলিশের মৌসুমে জেলে, আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে এক অস্বাভাবিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয়, যেখানে প্রকৃত জেলেরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। তারা ন্যায্য দাম পান না, বরং আড়তদারদের খামখেয়ালিতে নির্ভরশীল থাকেন।
ইলিশের দাম নির্ধারণে সিন্ডিকেট ভূমিকা রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। সকালেই নির্ধারিত হয় দিনের দাম, যা ক্রেতা বা জেলের হাতে প্রভাবিত হয় না। অনেক আড়তে ওজনে কম দেয়া হয়। আধুনিক ডিজিটাল স্কেল ব্যবহারের অভাব এবং মনিটরিংয়ের ঘাটতিতে এই সমস্যা রয়ে গেছে বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ বা ভোক্তা অধিকার সংস্থার তৎপরতা মৌসুমি এবং অল্প সময়ের জন্য কার্যকর হয়। জেলেরা সংগঠিত না থাকায় তারা দরকষাকষিতে পিছিয়ে পড়ে এবং দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে না। জেলেদের সরাসরি বাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এর জন্য মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলোর সক্রিয়তা জরুরি। প্রতিনিয়ত ভোক্তা অধিকার সংস্থা ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। ইলিশ বিপণনে প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন হাট ও ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। নিষিদ্ধ মৌসুমে জেলেদের প্রণোদনা কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা অবৈধভাবে মাছ ধরে বাজারকে প্রভাবিত না করে। চাঁদপুরের ইলিশ বাজার শুধু অর্থনৈতিকই নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ও গর্বের প্রতীক। এর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা ফিরিয়ে আনলে ইলিশ ব্যবসা আরও টেকসই ও লাভজনক হবে। সরকার, ব্যবসায়ী ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগেই সম্ভব একটি সুন্দর, ন্যায্য ও সুশাসনভিত্তিক ইলিশ বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
বর্তমান যুগ ডিজিটাল। গ্রাহক এখন ঘরে বসেই মোবাইল ফোনে একটি ক্লিক করে মাছ-মাংস কিনে ফেলছেন। এই প্রবণতা থেকে বাদ যায়নি ইলিশও। বিশেষ করে চাঁদপুরের ইলিশকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনলাইনে চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু এই চাহিদার সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে কিছু অসাধু প্রতারক চক্র, যারা অনলাইনে ইলিশ বিক্রির নামে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ইলিশের মতো একটি উচ্চমূল্যের পণ্যের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন ই-কমার্স সাইট, ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত উদ্যোক্তারা এখন চাঁদপুর, ভোলা, পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ইলিশ সংগ্রহ করে দেশের শহরাঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে করে একদিকে যেমন শহরবাসী সহজে ইলিশ পাচ্ছেন, অন্যদিকে জেলেরা ও খুচরা বিক্রেতারা পাচ্ছেন লাভের নতুন পথ। বিশেষ করে প্যাকেটজাতকরণ, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ডেলিভারি এবং কাস্টমার রিভিউয়ের কারণে নির্ভরযোগ্য অনেক অনলাইন ব্যবসা সফলভাবে ইলিশ সরবরাহ করছে। তবে এই ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এক অন্ধকার দিকও দেখা দিয়েছে—তা হলো প্রতারক চক্রের দৌরাত্ম্য। ফেসবুকে “চাঁদপুরের আসল ইলিশ”, “ভেজালমুক্ত নদীর ইলিশ”, “ডাইরেক্ট নৌকা থেকে” ইত্যাদি আকর্ষণীয় প্রচার দিয়ে অনেকেই ফেসবুক পেজ বা অ্যাকাউন্ট খুলে মাছ বিক্রির নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য না পাঠিয়েই উধাও হয়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত কম দামে ইলিশ বিক্রির প্রলোভন দেখানো (যেমন: ১ কেজি ইলিশ ৮০০ টাকা)। বিকাশ/নগদে অগ্রিম টাকা চাওয়া।  পণ্য না পাঠিয়ে মোবাইল বন্ধ করা বা ব্লক করে দেওয়া।  ভুয়া কুরিয়ার রশিদ পাঠানো।নকল ছবি বা পুরনো ভিডিও দিয়ে গ্রাহককে বিশ্বাসে আনা।  রাজধানীর এক শিক্ষক জানান, “একটি ফেসবুক পেজ থেকে ৪ কেজি ইলিশের অর্ডার দিই। ৩৫০০ টাকা বিকাশ করি। এরপর থেকে পেজ বন্ধ, মোবাইল বন্ধ—কোনো খোঁজ নেই।” চাঁদপুরের স্থানীয় এক ডেলিভারি কোম্পানি মালিক বলেন, “অনেক সময় প্রতারকরা আমাদের নাম ব্যবহার করেও ফেক ডেলিভারি দাবি করে গ্রাহকদের ঠকায়।”
অভিনব প্রচার দেখেই টাকা না পাঠানো-যাচাই-বাছাই ছাড়া অগ্রিম টাকা না দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। বিশ্বস্ত ও রিভিউযুক্ত পেজ ব্যবহার-যেসব অনলাইন ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, কাস্টমার রিভিউ ভালো—তাদের কাছ থেকেই অর্ডার করা উচিত। প্রয়োজনে ক্যাশ অন ডেলিভারি-হাতে পণ্য পাওয়ার পর টাকা পরিশোধ সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা-ভুক্তভোগীরা পুলিশ সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করলে প্রতারকদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সম্ভব। সচেতনতা বৃদ্ধি-সামাজিক মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে যেন কেউ এসব প্রতারক চক্রের ফাঁদে না পড়ে।
চাঁদপুরের ইলিশ অনলাইনে বিক্রির মাধ্যমে যেমন এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি প্রতারকদের দৌরাত্ম্য এই খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। নিরাপদ ইলিশ কেনাবেচা নিশ্চিত করতে হলে যেমন ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা জরুরি, তেমনি গ্রাহকদের সচেতনতা ও সরকারের কার্যকর নজরদারি এখন সময়ের দাবি। ইলিশের জীবনচক্র নিয়ে গবেষণা বাড়ানো দরকার। কোথায়, কীভাবে তারা অবস্থান করে তা বোঝা গেলে আরও কার্যকর সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ইলিশ শুধু মাছ নয়—চাঁদপুরের পরিচয়, গর্ব ও অস্তিত্বের প্রতীক। এই মাছের সংকট মানেই একটি সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সংকট। চাঁদপুরে যদি মানুষই ইলিশ না পায়, তবে “ইলিশের রাজ্য” নামে খ্যাতির কোনো মানে থাকে না।
সরকার, প্রশাসন, জেলে সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী, গবেষক এবং সচেতন জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এখনই সময় এই ঐতিহ্য রক্ষা করার, নয়তো ভবিষ্যতের প্রজন্ম জানবে না—ইলিশের স্বাদ কেমন ছিল বা চাঁদপুরে একসময় কী ঐশ্বর্য ছিল।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।