খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

মানবিক কাজের সাংবাদিকতা ও আমাদের সমাজ

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫, ৮:৫২ অপরাহ্ণ
মানবিক কাজের সাংবাদিকতা ও আমাদের সমাজ

মানবিক কাজ এবং সাংবাদিকতা মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। সাংবাদিকতা একটি শক্তিশালী মাধ্যম যা মানুষের কষ্ট, দুর্ভোগ এবং অধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে। এটি মানবিক কাজের প্রভাব বৃদ্ধি করে এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করে। মানবিক সাংবাদিকতা শুধু খবর পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবতার সেবায় একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকতা সমাজের এমন শ্রেণির মানুষের সমস্যাগুলো তুলে ধরে, যাদের কথা সাধারণত শোনা যায় না। এটি ক্ষতিগ্রস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত, বা নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মানবিক বিপর্যয়, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বা সঙ্কটের সময় সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্য ভবিষ্যতে নীতি প্রণয়ন, সাহায্য কার্যক্রম এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাংবাদিকতা জনগণকে সচেতন করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বা শরণার্থী সংকট নিয়ে রিপোর্টিং বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং মানুষকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করে।সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ডকুমেন্টারি সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে।

বিভিন্ন এনজিও, সাহায্য সংস্থা, এবং মানবিক কার্যক্রমে সাংবাদিকতা প্রয়োজনীয় প্রচার নিশ্চিত করে। এটি তহবিল সংগ্রহ এবং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়ক। সংঘাতপূর্ণ এলাকা, যুদ্ধক্ষেত্র, বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাংবাদিকদের জীবনের ঝুঁকি থাকে। মানবিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য উপস্থাপন বা পক্ষপাতিত্ব বিশ্বাসযোগ্যতাকে হ্রাস করতে পারে। সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদের অভাব অনেক সময় মানবিক কভারেজকে বাধাগ্রস্ত করে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার বা প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেয়, যা তাদের কার্যক্রমকে সীমিত করে। রোহিঙ্গা সংকট ও সাংবাদিকতার ভূমিকা-২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্যাতন ও গণহত্যা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক মিডিয়া যেমন বিবিসি, সিএনএন, এবং আল-জাজিরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা তুলে ধরেছিল। স্থানীয় সাংবাদিকরাও কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরের পরিস্থিতি এবং চাহিদা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেন। এই প্রতিবেদনগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়েছিল এবং ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়ক হয়েছিল।সাংবাদিকতা প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা পরিচালনার ভিত্তি তৈরি করেছে।

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় রিপোর্ট সংগ্রহের সময় সাংবাদিকরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। যেমন-সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং সাংবাদিকতার ভূমিকা : ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘাতে লক্ষাধিক মানুষ নিহত এবং মিলিয়ন মানুষ শরণার্থী হয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বেসামরিক জনগণের দুর্দশা তুলে ধরেছে। বিবিসি, আল-জাজিরা, এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়া সিরিয়ার শরণার্থী সংকট নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। ইউএন এবং এনজিও সংস্থাগুলোর জন্য এই প্রতিবেদনগুলো সাহায্যের আবেদন এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য নথিভুক্ত করতে সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বিপজ্জনক পরিবেশে সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়েছে। অনেক সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন। সেন্সরশিপ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান সাংবাদিকতাকে আরও সহজ ও কার্যকর করে তুলেছে। ড্রোন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এবং ডেটা জার্নালিজম মানবিক কাজকে উন্নত করছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের চেয়ে ভালোভাবে স্থানীয় পরিস্থিতি তুলে ধরতে সক্ষম। তাদের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবিক সাংবাদিকতা আরও কার্যকর করতে এনজিও, সরকার, এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। মানবিক সাংবাদিকতা মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে এবং মানবাধিকার রক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। এটি শুধু সমস্যার চিত্রায়ন নয়, বরং সমস্যার সমাধানে সমাজ ও সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সাংবাদিকতা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং অবহেলার কথা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে এটি সচেতনতা বৃদ্ধি, তহবিল সংগ্রহ এবং মানবিক সাহায্য কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হয়।

মানবিক সাংবাদিকতার প্রসার এবং তার গভীরতা অনেক। সাংবাদিকরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করেন এবং এটি জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করেন। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়া, ইয়েমেন, এবং আফগানিস্তানে সংঘাতের সময় মানবিক সাংবাদিকতা বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করেছে।উদাহরণ: ২০১০ সালের হাইতির ভূমিকম্পের সময় সাংবাদিকতা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে মানুষকে প্রস্তুত করতে এবং পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসন কার্যক্রমে সাহায্য করে। বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সংকট—যেমন রোহিঙ্গা শরণার্থী, সিরিয়ার উদ্বাস্তু এবং আফগান শরণার্থীদের দুর্দশা—সাংবাদিকতা মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাকে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাংবাদিকতা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা তুলে ধরে। দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাব নিয়ে রিপোর্ট জনগণের সচেতনতা বাড়ায়। যুদ্ধ বা সংঘাত শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। উদাহরণ: ইরাক এবং আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরা হয়েছিল।

সাংবাদিকতার নীতিগত দিক : মানবিক সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন মানবিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের গোপনীয়তা রক্ষা করা মানবিক সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং পরিবেশন করা সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। অতিরঞ্জিত তথ্য বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে। মানবিক সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হলো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। এজন্য সাংবাদিকদের একটি নৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। যেমন-ইয়েমেনের মানবিক সংকট-২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের সংঘাতের ফলে লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্য সংকট, অপুষ্টি এবং চিকিৎসার অভাবে ইয়েমেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর (বিবিসি, সিএনএন) প্রতিবেদন ইয়েমেনের ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরেছিল। ইয়েমেনের শিশুদের অপুষ্টি এবং মৃত্যুহারের ভয়াবহতা বিশ্বের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
৩. এই প্রতিবেদনগুলো সাহায্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করেছে। এতে তুলে ধরা হয়-যুদ্ধক্ষেত্রে রিপোর্টিংয়ের ঝুঁকি। তথ্য সংগ্রহে স্থানীয় সরকার ও গোষ্ঠীর বাধা।

এছাড়াও বাংলাদেশে নদীভাঙন ও স্থানচ্যুতি-বাংলাদেশে নদীভাঙন প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে বাস্তুহীন করে তুলছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্টের চিত্র তুলে ধরেছেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। সরকারের পুনর্বাসন কার্যক্রমকে গতিশীল করতে মিডিয়া রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এতে চ্যালেঞ্জ ছিলো দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অভাব। বিষয়টিকে স্থায়ীভাবে আলোচনায় রাখা কঠিন।

মানবিক সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা : যুদ্ধ বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার সময় সাহস এবং কৌশল প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় সহানুভূতি এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে আচরণ করতে হয়। ড্রোন এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। গভীর গবেষণার মাধ্যমে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা মানবিক সাংবাদিকতার একটি অপরিহার্য অংশ।

মানবিক সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ করণীয় : ডেটা জার্নালিজম, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ভিআর প্রযুক্তি সাংবাদিকতাকে আরও কার্যকর করে তুলবে। মানবিক সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ সাংবাদিকদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। স্থানীয় সাংবাদিকরা স্থানীয় পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তাদের গুরুত্ব আরও বাড়াতে হবে। সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।

মানবিক কাজে সাংবাদিকতা শুধুমাত্র তথ্য পরিবেশনের একটি মাধ্যম নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। যুদ্ধ, সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলোতে সাংবাদিকতা সচেতনতা তৈরি করে এবং সমাধানের পথ দেখায়। তবে এই কাজ ঝুঁকিপূর্ণ এবং জটিল। সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানবিক সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করা সম্ভব। বিশ্বকে আরও মানবিক এবং সহানুভূতিশীল করে তুলতে সাংবাদিকতার ভূমিকা অমূল্য। এটি কেবল সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে না, বরং বিশ্ববাসীর মধ্যে সংহতির বোধও জাগ্রত করে। মানবিক কাজে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্ব। এটি অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। রোহিঙ্গা সংকট, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, বা অন্যান্য মানবিক বিপর্যয়—সব ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতা মানবিক সেবার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে সাংবাদিকতায় নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মানবিক কাজের প্রতি দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা বিশ্বকে আরও সহানুভূতিশীল এবং ন্যায়পরায়ণ সমাজ গঠনে সহায়ক হবে।

লেখক পরিচিতি : বিএসসি, এলএলবি, এমসিএস, গনমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ২০২১ (পিআইবি)।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।