খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

মানুষ তাঁর কল্পনাতেই সুন্দর বাস্ববতায় সংগ্রামী

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৫, ২:২৫ অপরাহ্ণ
মানুষ তাঁর কল্পনাতেই সুন্দর বাস্ববতায় সংগ্রামী

মানুষকে বলা হয় সৃষ্টিশীল জীব, কারণ তার সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা তাকে প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। সৃষ্টিশীলতা হলো এমন একটি গুণ, যা মানুষের চিন্তা, কল্পনা, এবং নতুন কিছু তৈরি করার সামর্থ্যকে তুলে ধরে। এটি শুধু শিল্প বা সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, এবং প্রতিদিনের জীবনযাপনেও প্রভাব ফেলে। মানুষের এই সৃজনশীল গুণের মাধ্যমে সভ্যতা এগিয়ে চলেছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে।  সৃষ্টিশীলতা বলতে বোঝায় এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ নতুন কিছু তৈরি করে বা বিদ্যমান জিনিসে নতুনত্ব আনে। এটি হতে পারে একটি ছবি আঁকা, একটি গান রচনা করা, একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা, বা একটি সমস্যার অনন্য সমাধান বের করা। সৃষ্টিশীলতা কেবল শৈল্পিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

মানুষের কল্পনা করার শক্তি তার সৃষ্টিশীলতার মূল চালিকা শক্তি। কল্পনার মাধ্যমে মানুষ এমন জিনিস কল্পনা করতে পারে যা বাস্তবে এখনও সম্ভব হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞানীরা মহাকাশ ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। মানুষের সৃজনশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যমান জিনিসকে উন্নত করার ক্ষমতা। উদাহরণস্বরূপ, হুইল আবিষ্কারের পর মানুষ সেটি ব্যবহার করে গাড়ি, বাইসাইকেল এবং আরও উন্নত যানবাহন তৈরি করেছে। মানুষ তার সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার সৃজনশীলতারই ফল।
মানুষের সৃষ্টিশীলতা বিভিন্ন ধরনের শিল্প এবং সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রেখেছে। এটি মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর, অর্থবহ, এবং সমৃদ্ধ করেছে।

শিল্পের জগতে সৃষ্টিশীলতা মানুষের সৃজনশীলতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির “মোনালিসা” থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, সঙ্গীত, এবং চিত্রকলা—সবই মানুষের সৃষ্টিশীলতার ফল। বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন থেকে শুরু করে এলন মাস্ক পর্যন্ত, সবাই সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দিয়েছেন। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কার বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে, আর মাস্কের টেসলা এবং স্পেসএক্স প্রযুক্তির দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। মানুষের সৃজনশীলতা প্রযুক্তির অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন—সবকিছুই সৃষ্টিশীলতার উদাহরণ। মানুষের সৃজনশীলতার প্রভাব সমাজের কাঠামোতেও দেখা যায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইন, এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সৃষ্টিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সৃষ্টিশীলতা বিকাশের জন্য একটি উপযোগী পরিবেশ প্রয়োজন। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, এবং সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় মানুষ নতুন কিছু করতে ভয় পায় বা নিজেকে অক্ষম মনে করে। এটি সৃষ্টিশীলতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। সৃষ্টিশীল কার্যক্রমের জন্য সময় এবং সম্পদের প্রয়োজন। যখন এগুলোর অভাব হয়, তখন সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ধীরগতিতে হয়। মানুষের সৃষ্টিশীলতা বিকাশের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সৃজনশীল চিন্তাভাবনা উৎসাহিত করা উচিত। সৃষ্টিশীলতা বিকাশের জন্য উন্মুক্ত চিন্তাভাবনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এটি মানুষের মনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে সাহায্য করে। পরিবেশ এমন হতে হবে, যেখানে মানুষ তার সৃজনশীলতাকে প্রয়োগ করতে এবং পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন কিছু শিখতে পারে। মানুষকে তার সৃজনশীলতা প্রকাশের জন্য উৎসাহ এবং সমর্থন প্রদান করা প্রয়োজন। এটি তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং নতুন কিছু করার প্রেরণা যোগায়।
মানুষ প্রকৃতির একটি অনন্য সৃষ্টি। তার সৃষ্টিশীলতার জন্যই সভ্যতা আজ এতদূর এগিয়েছে। সৃষ্টিশীলতা শুধু একটি ব্যক্তিগত গুণ নয়, এটি একটি সামাজিক সম্পদ। সৃষ্টিশীল মানুষের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বিশ্ব নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে চলেছে। তাই সৃষ্টিশীলতাকে লালন এবং বিকাশ করার জন্য সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে। মানুষের সৃষ্টিশীলতা যত বৃদ্ধি পাবে, ততই সভ্যতা উন্নতির শিখরে পৌঁছাবে।

কল্পনা মানুষের সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এটি এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে, নতুন ধারণা তৈরি করতে এবং অজানা বিষয় সম্পর্কে চিন্তা করতে সক্ষম হয়। কল্পনার ক্ষমতা মানুষকে প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে এবং তাকে উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার পথে পরিচালিত করে। কল্পনার সংজ্ঞা কল্পনা হলো মানুষের মনের এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বাস্তবে দেখা বা উপলব্ধি করা তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কিছু তৈরি করা হয়। এটি হতে পারে বাস্তব অভিজ্ঞতার রূপান্তর বা সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা।
কল্পনার মাধ্যমে মানুষ অতীত অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিকাজ শুরুর আগে মানুষ প্রকৃতির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে তা থেকে ভবিষ্যতের জন্য ধারণা তৈরি করেছে। কল্পনার ক্ষমতা মানুষের মধ্যে জিজ্ঞাসার উদ্রেক ঘটায়। এটি মানুষকে এমন বিষয় নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে, যা সে আগে কখনও দেখেনি বা জানেনি। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞানীরা কল্পনার মাধ্যমে মহাকাশ অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন। কল্পনার ক্ষমতা সৃজনশীলতাকে জ্বালানি যোগায়। নতুন শিল্পকর্ম, প্রযুক্তি, বা সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে কল্পনার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। মানুষ তার কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে একই সমস্যার বিভিন্ন সমাধান খুঁজে বের করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এক সমস্যার জন্য একাধিক প্রযুক্তি বা পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের কল্পনার শক্তি বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব তার গভীর কল্পনার ফল। তেমনি, জুল ভার্নের বইতে মহাকাশ ভ্রমণের ধারণা বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির “দ্য লাস্ট সাপার” বা মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর “ডেভিড” মূর্তি তাদের কল্পনার একটি অসাধারণ প্রকাশ। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, এবং রোবোটিকসের পেছনে মানুষের কল্পনার বড় ভূমিকা রয়েছে। স্মার্টফোনের ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনাকে একীভূত করার একটি উদাহরণ। অনেক সময় মানুষের কল্পনা বাস্তবতার সীমারেখায় আটকে যায়। এটি উদ্ভাবন প্রক্রিয়াকে ধীর করে। কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহস এবং প্রেরণা প্রয়োজন। অনুপ্রেরণার অভাব কল্পনাশক্তিকে দমিয়ে দিতে পারে। কখনও কখনও মানুষের কল্পনা নেতিবাচক হতে পারে, যা তাকে ভয় বা উদ্বেগের দিকে ঠেলে দেয়। এটি তার মানসিক স্বাস্থ্য ও কার্যক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।

বই পড়া এবং নতুন বিষয় শেখার মাধ্যমে কল্পনার শক্তি বৃদ্ধি পায়। মুক্ত চিন্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে। আঁকা, লেখা, বা মিউজিকের মতো সৃজনশীল কাজ কল্পনাশক্তিকে জাগ্রত করে। পরিবেশ এমন হতে হবে, যেখানে নতুন ধারণা গ্রহণযোগ্য এবং উৎসাহিত হয়। কল্পনার ক্ষমতা মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি শুধু নতুন কিছু তৈরি করতেই নয়, বরং ভবিষ্যতের উন্নয়নের দিকনির্দেশনা দিতে সাহায্য করে। মানুষের কল্পনাশক্তি যতই বিকশিত হবে, ততই সভ্যতা আরও সমৃদ্ধ হবে। তাই কল্পনার শক্তিকে লালন এবং বিকাশ করার জন্য প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা, পরিবেশ এবং মানসিক উদ্দীপনা।

মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সংশোধন এবং উন্নয়নের ক্ষমতা। এই গুণের মাধ্যমে মানুষ তার ভুলত্রুটি শুধরে নিতে পারে এবং বিদ্যমান জিনিসকে আরও ভালো ও কার্যকর করতে পারে। সংশোধন ও উন্নয়নের ক্ষমতাই মানুষের অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। এর ফলেই সভ্যতার ক্রমোন্নতি সম্ভব হয়েছে এবং মানুষ প্রকৃতির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পেরেছে। সংশোধনের ক্ষমতা মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ তার ভুলগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা মানুষকে আরও উন্নত করে তোলে।
প্রতিদিনের জীবনে মানুষ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়, যেগুলোর কিছু সঠিক হয়, কিছু ভুল। ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে সংশোধনের ক্ষমতা প্রকাশ পায়। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভুল উত্তর দিলে পরবর্তী সময়ে সঠিক উত্তর শিখে নেয়। তেমনি কর্মক্ষেত্রে ভুল কর্মপরিকল্পনা সংশোধন করে সঠিক পথে এগোনোর মাধ্যমে উন্নতি ঘটে। মানব ইতিহাসের ভুল সিদ্ধান্ত, যেমন যুদ্ধ বা পরিবেশ ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষ বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে আরও টেকসই করার চেষ্টা করছে। উন্নয়ন হলো মানুষের প্রগতিশীল মানসিকতার প্রতিফলন। এটি বিদ্যমান অবস্থা থেকে আরও ভালো কিছু তৈরি করার প্রক্রিয়া। মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

মানুষের উন্নয়নের ক্ষমতা নতুন নতুন প্রযুক্তি, ধারণা এবং পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। উদাহরণস্বরূপ, আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, সবই উন্নয়নের উদাহরণ। উন্নয়ন মানে শুধু নতুন কিছু তৈরি করা নয়, বরং সমস্যার আরও কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা। উদাহরণস্বরূপ, পরিবেশ দূষণ রোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত। উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষ এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চায়, যা দীর্ঘস্থায়ী এবং সকলের জন্য উপকারী। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মানুষের উন্নয়ন বিস্ময়কর। টেলিগ্রাফ থেকে শুরু করে আজকের ইন্টারনেট—এটি উন্নয়নের ধারাবাহিক উদাহরণ। তেমনি, বিজ্ঞানে ভ্যাকসিনের উদ্ভাবন মানুষের জীবনের গুণগত মান উন্নত করেছে। সমাজের কাঠামো উন্নত করার জন্য মানুষ আইন, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি ঘটিয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মানুষের উন্নয়নের ক্ষমতা লক্ষণীয়। বার্টার সিস্টেম থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল লেনদেন পর্যন্ত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
কিছু মানুষ পরিবর্তন বা উন্নয়নকে ভয় পায়, যা সংশোধন এবং অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যথাযথ শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে মানুষ প্রায়ই তার ভুল বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং উন্নয়নের সুযোগ হাতছাড়া করে। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাব সংশোধন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। সংশোধন ও উন্নয়নের ক্ষমতা বিকাশের উপায়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে তার ভুলত্রুটি চিহ্নিত করার ক্ষমতা এবং উন্নয়নের পদ্ধতি শেখানো যায়। সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা মানুষের সংশোধন ও উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন ধারণা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করলে মানুষ উন্নয়নের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে। সংশোধন ও উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার মানুষের ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
সংশোধন এবং উন্নয়নের ক্ষমতা মানুষের সৃষ্টিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মানুষকে তার ভুল থেকে শিক্ষা নিতে এবং উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এই ক্ষমতার মাধ্যমেই মানুষ যুগে যুগে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ভবিষ্যতেও এই গুণ মানুষের অগ্রগতি এবং পৃথিবীকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হবে।

লেখক : উজ্জ্বল হোসাইন, লেখক ও প্রাবন্ধিক।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।