খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

কাঙাল হরিনাথ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৫, ১১:৫১ অপরাহ্ণ
কাঙাল হরিনাথ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

কাঙাল হরিনাথ, প্রকৃত নাম হরিনাথ মজুমদার, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং পথিকৃৎ। উনিশ শতকের মধ্যভাগে যখন ব্রিটিশ উপনিবেশের চাপে বাঙালি জাতি সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছিল, তখন তিনি একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সাংবাদিকতা, সাহিত্য এবং সমাজ সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কেবল সংবাদ পরিবেশনই নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য।

কাঙাল হরিনাথের জন্ম ১৮৩৩ সালে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার অন্তর্গত গ্রাম চাপড়াতে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাঁর শৈশব ছিল অভাব-অনটনে ভরা। তিনি প্রথাগত শিক্ষায় খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেননি। তবে নিজের প্রচেষ্টায় বাংলাসহ সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা আয়ত্ত করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রবল তৃষ্ণা ছিল, যা তাঁকে স্বশিক্ষিত করে তোলে।

১৮৬৩ সালে, হরিনাথ “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। এটি ছিল গ্রামের সাধারণ মানুষের সমস্যা, তাঁদের জীবনের কথা এবং সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম। তাঁর এই পত্রিকা একসময় সাপ্তাহিক রূপ নেয় এবং তা পুরো বাংলায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ব্রিটিশ শাসনের দুর্নীতি, জমিদারদের অত্যাচার এবং সমাজের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি তাঁর কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

“গ্রামবার্তা প্রকাশিকা”র বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর সহজ-সরল ভাষা। হরিনাথ বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে সত্য তুলে ধরা। তাই তাঁর পত্রিকার ভাষা ছিল প্রাঞ্জল এবং সহজবোধ্য। তিনি গ্রামের কৃষক, শ্রমিক এবং দরিদ্র মানুষের জন্য লিখতেন, যা তখনকার অভিজাতদের সাংবাদিকতার ধরন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

কাঙাল হরিনাথ কেবল সাংবাদিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি জমিদারদের শোষণ এবং মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে তিনি কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং তাঁদের কষ্টের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই পারে সমাজকে পরিবর্তন করতে। তাই গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন।

হরিনাথ নারীদের শিক্ষা এবং অধিকারেও জোর দিয়েছিলেন। যদিও সে সময় নারী শিক্ষা নিয়ে সামাজিকভাবে প্রচুর বাধা ছিল, তবুও তিনি এ বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীদের উন্নয়ন ছাড়া সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি হরিনাথ সাহিত্যচর্চাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর লেখায় সমাজের বাস্তবতা, মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং তাদের সংগ্রামের চিত্র উঠে আসে। তিনি বিভিন্ন কবিতা, গান এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি নিজে একজন গীতিকার এবং সুরকার ছিলেন। তাঁর রচিত গানগুলো মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেম এবং সমাজ সংস্কারের জন্য উদ্বুদ্ধ করত।

তাঁর দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের জন্য তিনি নিজেকে “কাঙাল” বলে অভিহিত করতেন। তবে তাঁর দারিদ্র্য কখনোই তাঁর মানসিক শক্তি এবং সৃজনশীলতার উপর প্রভাব ফেলেনি। তাঁর “কাঙাল” পরিচিতি তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। তিনি তাঁদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের জীবনের সঙ্গে একাত্ম করে ফেলেছিলেন।

হরিনাথ ব্রিটিশ শাসনের অবিচার এবং তাদের শোষণমূলক নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর পত্রিকায় তিনি এই শোষণ, বিশেষ করে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার, তুলে ধরেছিলেন। নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় তাঁর কলম হয়ে ওঠে এক শক্তিশালী অস্ত্র।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকা প্রকাশিত হওয়ার পর এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও, জমিদার এবং ব্রিটিশ শাসকদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হরিনাথকে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত আর্থিক সংকটের কারণে পত্রিকাটি বন্ধ করতে হয়। তবে তাঁর সাংবাদিকতার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ছিল।

১৮৯৬ সালে হরিনাথের মৃত্যু হয়। তাঁর কাজ এবং আদর্শ বাঙালির সাংবাদিকতার ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে সাংবাদিকতা কেবল তথ্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার। তাঁর সাহসী এবং সৎ সাংবাদিকতার ধারা আজও অনুসরণীয়।

কাঙাল হরিনাথের জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি, নিষ্ঠা এবং ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাঁর কাজ এবং সংগ্রাম আজও আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। তিনি কেবল একজন সাংবাদিক বা লেখক নন; তিনি একজন যোদ্ধা, যিনি সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য জীবনভর লড়াই করেছেন।

কাঙাল হরিনাথ তাঁর সাংবাদিকতায় যে বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছিলেন, তা ছিল সেই সময়ের জন্য এক নতুন দিগন্ত। তখনকার সমাজে সাংবাদিকতা মূলত অভিজাত শ্রেণির কণ্ঠস্বর হিসেবেই পরিচিত ছিল। জমিদার, ব্রিটিশ প্রশাসন ও ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু হরিনাথ এই প্রথার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতাকে সাধারণ মানুষের সমস্যার কণ্ঠস্বর করে তোলেন। তিনি মনে করতেন, সাংবাদিকতার মাধ্যমে কৃষক, শ্রমিক ও সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের সমস্যাগুলোকে তুলে ধরা প্রয়োজন।

“গ্রামবার্তা প্রকাশিকা”র প্রতিটি সংখ্যায় তখনকার সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ও সমসাময়িক বিষয়গুলো উঠে আসত। এর মধ্যে জমিদারদের অত্যাচার, ব্রিটিশ শাসকদের শোষণ, মহাজনদের চক্রান্ত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার দুঃখ-কষ্ট ছিল মূল প্রতিপাদ্য। হরিনাথ তাঁর কলামে গ্রামের কৃষকদের শোষণ এবং নীল চাষের ভয়াবহতা তুলে ধরেন, যা ব্রিটিশ শাসক ও স্থানীয় জমিদারদের কাছে অপছন্দনীয় হয়ে ওঠে।

তাঁর সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি সমাজের দুর্নীতি, কুসংস্কার, বর্ণবৈষম্য এবং নারী অধিকার নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং এর মাধ্যমে সমাজে সচেতনতা তৈরি করা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাই সাংবাদিকতার আসল লক্ষ্য।

নীল বিদ্রোহ বাংলার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। নীলচাষীদের ওপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচার এবং তাদের শোষণের কাহিনী কাঙাল হরিনাথ তুলে ধরেন তাঁর পত্রিকায়। নীলচাষীদের দুরবস্থা এবং তাদের প্রতি ব্রিটিশ ও জমিদারদের নিষ্ঠুর আচরণ নিয়ে তাঁর প্রতিবেদনগুলো মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

নীল বিদ্রোহের সময় হরিনাথ তাঁর কলমকে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা”র মাধ্যমে নীল চাষের শোষণ ও অত্যাচারের বিষয়টি জনসম্মুখে আনেন। সাধারণত, নীলকর সাহেবদের ক্ষমতা ও প্রভাবের কারণে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। কিন্তু হরিনাথ সাধারণ কৃষকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের সমস্যা তুলে ধরতে দ্বিধা করেননি। তিনি বিভিন্ন প্রতিবেদনে চাষিদের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী বর্ণনা করেন এবং ব্রিটিশ শাসনের শোষণমূলক নীতিগুলোর প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রতিবেদনগুলো ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তাঁর লেখার মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে প্রতিরোধের চেতনা জাগ্রত হয় এবং তাদের একত্রিত করে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর এই ভূমিকা তাঁকে শুধু সাংবাদিকই নয়, একজন সমাজসংস্কারক এবং সংগ্রামী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।

কাঙাল হরিনাথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ভাষার সহজতা। তিনি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের কথা সহজ, সরল এবং প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশ করতেন। “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা”র প্রতিটি লেখায় গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং তাঁদের সংকটগুলো উঠে আসত। তিনি মনে করতেন, সাংবাদিকতার ভাষা এমন হওয়া উচিত যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে। এর ফলে তাঁর পত্রিকা গ্রামবাংলার কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

হরিনাথ সাংবাদিকতার পাশাপাশি গীতিকার, সুরকার এবং কবি হিসেবেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বহু গান রচনা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে গ্রামবাংলার মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর গানগুলোয় সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম এবং সমাজের অসঙ্গতিগুলো প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে, তাঁর রচিত “পল্লীগীতি” এবং “বাউল গান” সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

তাঁর রচনাগুলো কেবল সাহিত্যিক গুরুত্বের জন্যই নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তন এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্যও তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সঙ্গীত এবং সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও হরিনাথের মানবিকতা ছিল গভীর। তিনি সবসময় অসহায় এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করতে কখনো পিছপা হননি। “কাঙাল” উপাধিটি নিজেই ধারণ করে তিনি দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য মানুষকে মহৎ হওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বরং তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আত্মনিবেদন এবং সৎ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দারিদ্র্যকে জয় করা সম্ভব।

হরিনাথ মজুমদারের কাজ ও আদর্শ বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। তিনি সাংবাদিকতাকে কেবল তথ্যানুসন্ধান এবং পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং সাংবাদিকতাকে সমাজের সমস্যার সমাধান ও জনমতের পরিবর্তনের হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছিলেন।

তাঁর সাহসিকতা এবং নীতিবোধ নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক ও লেখকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। তাঁর দেখানো পথ ধরে পরবর্তীতে আরও অনেক সাংবাদিক এবং সমাজ সংস্কারক এগিয়ে এসেছেন।

১৮৯৬ সালে কাঙাল হরিনাথের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর কাজ এবং আদর্শ তাঁকে চিরকাল স্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, কঠিন পরিস্থিতিতেও নৈতিকতা এবং সাহস বজায় রেখে সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

কাঙাল হরিনাথ ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সমাজের অবহেলিত মানুষের জন্য। সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংগীত এবং সমাজসেবার মাধ্যমে তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অগ্রগতিতে বিশাল অবদান রেখেছেন। তিনি ছিলেন এমন একজন পথিকৃৎ, যিনি নিজের সীমিত সম্পদ এবং অসুবিধা সত্ত্বেও সমাজের জন্য অবিচলভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর জীবন ও কাজ আমাদের দেখায় যে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো কখনো বৃথা যায় না।

লেখক পরিচিতি  : উজ্জ্বল হোসাইন, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স (ব্যাচ ২০২১), পিআইবি।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।