খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১ মাঘ, ১৪৩২

মানবিক কাজের সাংবাদিকতা ও আমাদের সমাজ

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫, ৮:৫২ অপরাহ্ণ
মানবিক কাজের সাংবাদিকতা ও আমাদের সমাজ

মানবিক কাজ এবং সাংবাদিকতা মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। সাংবাদিকতা একটি শক্তিশালী মাধ্যম যা মানুষের কষ্ট, দুর্ভোগ এবং অধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে। এটি মানবিক কাজের প্রভাব বৃদ্ধি করে এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করে। মানবিক সাংবাদিকতা শুধু খবর পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবতার সেবায় একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকতা সমাজের এমন শ্রেণির মানুষের সমস্যাগুলো তুলে ধরে, যাদের কথা সাধারণত শোনা যায় না। এটি ক্ষতিগ্রস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত, বা নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মানবিক বিপর্যয়, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বা সঙ্কটের সময় সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্য ভবিষ্যতে নীতি প্রণয়ন, সাহায্য কার্যক্রম এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাংবাদিকতা জনগণকে সচেতন করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বা শরণার্থী সংকট নিয়ে রিপোর্টিং বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং মানুষকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করে।সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ডকুমেন্টারি সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নীতিনির্ধারণে সহায়তা করে।

বিভিন্ন এনজিও, সাহায্য সংস্থা, এবং মানবিক কার্যক্রমে সাংবাদিকতা প্রয়োজনীয় প্রচার নিশ্চিত করে। এটি তহবিল সংগ্রহ এবং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়ক। সংঘাতপূর্ণ এলাকা, যুদ্ধক্ষেত্র, বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাংবাদিকদের জীবনের ঝুঁকি থাকে। মানবিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য উপস্থাপন বা পক্ষপাতিত্ব বিশ্বাসযোগ্যতাকে হ্রাস করতে পারে। সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদের অভাব অনেক সময় মানবিক কভারেজকে বাধাগ্রস্ত করে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার বা প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেয়, যা তাদের কার্যক্রমকে সীমিত করে। রোহিঙ্গা সংকট ও সাংবাদিকতার ভূমিকা-২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্যাতন ও গণহত্যা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক মিডিয়া যেমন বিবিসি, সিএনএন, এবং আল-জাজিরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা তুলে ধরেছিল। স্থানীয় সাংবাদিকরাও কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরের পরিস্থিতি এবং চাহিদা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেন। এই প্রতিবেদনগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়েছিল এবং ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়ক হয়েছিল।সাংবাদিকতা প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা পরিচালনার ভিত্তি তৈরি করেছে।

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় রিপোর্ট সংগ্রহের সময় সাংবাদিকরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। যেমন-সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং সাংবাদিকতার ভূমিকা : ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘাতে লক্ষাধিক মানুষ নিহত এবং মিলিয়ন মানুষ শরণার্থী হয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বেসামরিক জনগণের দুর্দশা তুলে ধরেছে। বিবিসি, আল-জাজিরা, এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়া সিরিয়ার শরণার্থী সংকট নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। ইউএন এবং এনজিও সংস্থাগুলোর জন্য এই প্রতিবেদনগুলো সাহায্যের আবেদন এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য নথিভুক্ত করতে সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বিপজ্জনক পরিবেশে সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়েছে। অনেক সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন। সেন্সরশিপ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান সাংবাদিকতাকে আরও সহজ ও কার্যকর করে তুলেছে। ড্রোন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এবং ডেটা জার্নালিজম মানবিক কাজকে উন্নত করছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের চেয়ে ভালোভাবে স্থানীয় পরিস্থিতি তুলে ধরতে সক্ষম। তাদের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবিক সাংবাদিকতা আরও কার্যকর করতে এনজিও, সরকার, এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। মানবিক সাংবাদিকতা মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে এবং মানবাধিকার রক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। এটি শুধু সমস্যার চিত্রায়ন নয়, বরং সমস্যার সমাধানে সমাজ ও সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সাংবাদিকতা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং অবহেলার কথা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে এটি সচেতনতা বৃদ্ধি, তহবিল সংগ্রহ এবং মানবিক সাহায্য কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হয়।

মানবিক সাংবাদিকতার প্রসার এবং তার গভীরতা অনেক। সাংবাদিকরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করেন এবং এটি জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করেন। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়া, ইয়েমেন, এবং আফগানিস্তানে সংঘাতের সময় মানবিক সাংবাদিকতা বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করেছে।উদাহরণ: ২০১০ সালের হাইতির ভূমিকম্পের সময় সাংবাদিকতা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে মানুষকে প্রস্তুত করতে এবং পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসন কার্যক্রমে সাহায্য করে। বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সংকট—যেমন রোহিঙ্গা শরণার্থী, সিরিয়ার উদ্বাস্তু এবং আফগান শরণার্থীদের দুর্দশা—সাংবাদিকতা মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাকে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাংবাদিকতা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা তুলে ধরে। দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাব নিয়ে রিপোর্ট জনগণের সচেতনতা বাড়ায়। যুদ্ধ বা সংঘাত শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। উদাহরণ: ইরাক এবং আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরা হয়েছিল।

সাংবাদিকতার নীতিগত দিক : মানবিক সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন মানবিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের গোপনীয়তা রক্ষা করা মানবিক সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং পরিবেশন করা সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। অতিরঞ্জিত তথ্য বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে। মানবিক সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হলো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। এজন্য সাংবাদিকদের একটি নৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। যেমন-ইয়েমেনের মানবিক সংকট-২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের সংঘাতের ফলে লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্য সংকট, অপুষ্টি এবং চিকিৎসার অভাবে ইয়েমেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর (বিবিসি, সিএনএন) প্রতিবেদন ইয়েমেনের ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরেছিল। ইয়েমেনের শিশুদের অপুষ্টি এবং মৃত্যুহারের ভয়াবহতা বিশ্বের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
৩. এই প্রতিবেদনগুলো সাহায্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করেছে। এতে তুলে ধরা হয়-যুদ্ধক্ষেত্রে রিপোর্টিংয়ের ঝুঁকি। তথ্য সংগ্রহে স্থানীয় সরকার ও গোষ্ঠীর বাধা।

এছাড়াও বাংলাদেশে নদীভাঙন ও স্থানচ্যুতি-বাংলাদেশে নদীভাঙন প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে বাস্তুহীন করে তুলছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্টের চিত্র তুলে ধরেছেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। সরকারের পুনর্বাসন কার্যক্রমকে গতিশীল করতে মিডিয়া রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এতে চ্যালেঞ্জ ছিলো দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অভাব। বিষয়টিকে স্থায়ীভাবে আলোচনায় রাখা কঠিন।

মানবিক সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা : যুদ্ধ বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার সময় সাহস এবং কৌশল প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় সহানুভূতি এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে আচরণ করতে হয়। ড্রোন এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। গভীর গবেষণার মাধ্যমে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা মানবিক সাংবাদিকতার একটি অপরিহার্য অংশ।

মানবিক সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ করণীয় : ডেটা জার্নালিজম, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ভিআর প্রযুক্তি সাংবাদিকতাকে আরও কার্যকর করে তুলবে। মানবিক সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ সাংবাদিকদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। স্থানীয় সাংবাদিকরা স্থানীয় পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তাদের গুরুত্ব আরও বাড়াতে হবে। সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।

মানবিক কাজে সাংবাদিকতা শুধুমাত্র তথ্য পরিবেশনের একটি মাধ্যম নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। যুদ্ধ, সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলোতে সাংবাদিকতা সচেতনতা তৈরি করে এবং সমাধানের পথ দেখায়। তবে এই কাজ ঝুঁকিপূর্ণ এবং জটিল। সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে মানবিক সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করা সম্ভব। বিশ্বকে আরও মানবিক এবং সহানুভূতিশীল করে তুলতে সাংবাদিকতার ভূমিকা অমূল্য। এটি কেবল সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে না, বরং বিশ্ববাসীর মধ্যে সংহতির বোধও জাগ্রত করে। মানবিক কাজে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্ব। এটি অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। রোহিঙ্গা সংকট, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, বা অন্যান্য মানবিক বিপর্যয়—সব ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতা মানবিক সেবার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে সাংবাদিকতায় নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মানবিক কাজের প্রতি দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা বিশ্বকে আরও সহানুভূতিশীল এবং ন্যায়পরায়ণ সমাজ গঠনে সহায়ক হবে।

লেখক পরিচিতি : বিএসসি, এলএলবি, এমসিএস, গনমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ২০২১ (পিআইবি)।

কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ
কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

কুড়িগ্রামে শীত ও ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারদিক। গত কয়েক দিন থেকে আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও নেই উত্তাপ।হাসপাতাল গুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সোমবার (১২জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এদিকে কুয়াশা ও শীতের তীব্রতার সঙ্গে উত্তরীয় হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। হাসপাতালে আসা চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের জোড়গাছ এলাকার খলিল মিয়া বলেন, আমার ছেলের কয়েক দিন থেকে ডায়েরি তাই ভর্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পৌর শহরের কলেজ পাড়া এলাকার হোটেল শ্রমিক জাহিদ মিয়া বলেন, সকাল বেলা ঠান্ডা ও শীতে বাড়িত থাকি বের হওয়া যায় না। কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়, দুস্থ মানুষদের মধ্যে কম্বল বিতরণ চলমান রয়েছে। রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, সোমবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই জারি করা হয়েছে এ সতর্কতা। ইসরায়েলের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মধ্যে টেলিফোনে বৈঠক হয়েছে। মূলত ইরান পরিস্থিতিই ছিল সেই ফোনালাপের একমাত্র বিষয়বস্তু। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে নেতানিয়াহু-রুবিওর আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে রুবিওর সঙ্গে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগের দিন শুক্রবার মার্কিন দৈনিক দ্য ইকোনমিস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে ইরান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, “আমার মনে হয় কোনো ধারণাগত মন্তব্য না করে আমাদের উচিত হবে ইরানে কী ঘটছে, তা দেখা। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলন বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ। এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার এবং গতকাল শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিযাত শাখা ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে নামানো হয়েছে। শনিবার রাতে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি।
তবে ইরানের চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুন মাসে ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। টানা ১২ দিন সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল সেবার।

লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

রায়পুরসহ লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের অভিযান থাকলেও ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় থামছে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৫টায় রায়পুর শহরের প্রধান সড়কে তিনটি ও সদরের দক্ষিণ বাজারের গোডাউন এলাকায় ৪টি অভিযানে সাতটি মামলায় মোট দশ ডিলারকে ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।পৃথক এই অভিযান পরিচালনা করেন রায়পুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন ও নিরুপম মজুমদার। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্যে সরকারি দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। গৃহিণী আফসানা বলেন, ‘টিভিতে দামের ঘোষণা শুনি, কিন্তু দোকানে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না।’ ক্রেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়ে হলেও সহজে গ্যাস পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।’ খুশবু আক্তার বলেন, ‘তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নিতে বাধ্য করছে।’
পরিবেশক মোহাম্মদ কাজল ও ফাহিম বলেন, ‘গোডাউনে চাহিদার চেয়ে মাল কম। কোম্পানি থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বাজারে দাম বাড়ানো বাধ্যতামূলক।’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামসুল বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে।’ রায়পুর উপজেলা পরিষদের সামনে পিঠা বিক্রেতা আরিফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দৈনিক দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে।’
ওমেরা ও যমুনা এলপিজির পরিবেশক বেলাল হোসেন বলেন, ‘ওমেরা ও যমুনা কোম্পানির কোনও সংকট নেই। পাইকারি দামে ১৩৮০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি দামের চেয়ে বেশি কেনা হচ্ছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর শহরের ৭ জনকে ৪২ হাজার ও রায়পুর শহরের ৩ জন ব্যাবসায়ীকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নিই। অভিযোগ পেলে জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, না হলে সিন্ডিকেট ভাঙ্গা কঠিন হবে।’
রায়পুর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লুধুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এলপিজি বাজারের অনিয়ম উদ্বেগজনক। সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি ও ভোক্তাদের সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। না হলে নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।’
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাছান বলেন, লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ও সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এলপিজি-এর সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কালে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে সদরে ৭টি মামলায় ৪২ হাজার টাকা এবং রায়পুরে তিন মামলায় ১১ হাজার টাকা অর্থদন্ড আদায় করা হয়েছে। জনস্বার্থে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রুখতে জেলা প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি ও অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।