খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

সাংবাদিকতায় মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের প্রভাব

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৫, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকতায় মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের প্রভাব

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর যুগে সাংবাদিকতার ভূমিকা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তথ্য প্রবাহের সহজলভ্যতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের সমস্যা। সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে তৈরি ভুল তথ্যের মাধ্যমে সমাজের উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। এই প্রবন্ধে মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের সংজ্ঞা, প্রভাব, কারণ এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের সংজ্ঞা

মিস ইনফরমেশন (Misinformation) : মিস ইনফরমেশন হলো ভুল বা অসত্য তথ্য যা অজান্তে ছড়ানো হয়। এর উদ্দেশ্য সাধারণত ক্ষতিকারক নয়। যেমন: কেউ কোনো ভুল খবর বা তথ্য শেয়ার করলে, কিন্তু তিনি জানেন না যে সেটি ভুল।

ডিসইনফরমেশন (Disinformation) : ডিসইনফরমেশন হলো ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো। এটি সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে করা হয়, যেমন বিভ্রান্তি তৈরি করা, জনমত প্রভাবিত করা বা রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য।

সাংবাদিকতায় মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের ভূমিকা

১. তথ্য যাচাইয়ের অভাব : অনেক সময় সাংবাদিকরা তথ্য যাচাই না করেই সংবাদ প্রকাশ করেন। তথ্য যাচাইয়ের অভাবের ফলে মিস ইনফরমেশন ছড়িয়ে পড়ে।

২. ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার : ডিসইনফরমেশন অনেক সময় রাজনৈতিক বা আর্থিক লাভের জন্য করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনের আগে ভুয়া তথ্য প্রচার করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা।

৩. সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব : সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে দ্রুত গতিতে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মিথ্যা তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়।

৪. ট্রলিং ও বট অ্যাকাউন্ট : বিভিন্ন ট্রল গ্রুপ ও বট অ্যাকাউন্ট ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।

মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের প্রভাব

১. সামাজিক অস্থিরতা : ভুল তথ্য সমাজে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভুয়া খবর ছড়িয়ে সংঘর্ষ বাধানো।

২. রাজনৈতিক প্রভাব : ডিসইনফরমেশন রাজনৈতিক মতামত প্রভাবিত করতে ব্যবহৃত হয়। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

৩. সাংবাদিকতার প্রতি বিশ্বাস কমানো : বারবার ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমে যায়।

৪. গুজবের প্রসার : মিস ইনফরমেশন থেকে গুজব সৃষ্টি হয়, যা ব্যবসা, স্বাস্থ্য, এবং ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের কারণ

১. তথ্য যাচাইয়ের অভাব : অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে সংবাদ প্রকাশের জন্য তথ্য যাচাই করা হয় না।

২. সাংবাদিকতার উপর চাপ : সাংবাদিকদের উপর খবর দ্রুত প্রকাশের চাপ থাকে, যা ভুল তথ্য ছড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

৩. সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা : সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা তথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ভুয়া খবর দ্রুত ভাইরাল হয়।

৪. অপর্যাপ্ত নীতিমালা : অনেক দেশে ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে কার্যকর আইন বা নীতিমালা নেই।

৫. অজ্ঞতা ও অসচেতনতা : অনেক ব্যবহারকারী ভুল তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই তা শেয়ার করেন।

মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন প্রতিরোধে করণীয়

১. তথ্য যাচাইয়ের কৌশল শেখানো : সাংবাদিকদের তথ্য যাচাইয়ের টুলস ও কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।

২. সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ : সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে ফ্যাক্ট-চেকিং অপশন উন্নত করতে হবে।

৩. সচেতনতা বৃদ্ধি : সাধারণ মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

৪. কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন : ভুয়া খবর ছড়ানোর জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

৫. ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন : ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা দরকার।

উপসংহার : মিস ইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন সাংবাদিকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব বোঝা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা বজায় রেখে সঠিক তথ্য প্রকাশের প্রতি গুরুত্ব দেওয়াই এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।

লেখক : উজ্জ্বল হোসাইন, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ২০২১, প্রেস ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।