খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১ মাঘ, ১৪৩২

কবি নজরুলের রাজনৈতিক ও সমাজ সংস্কারমূলক ভাবনা

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১১:১৬ অপরাহ্ণ
কবি নজরুলের রাজনৈতিক ও সমাজ সংস্কারমূলক ভাবনা

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কবি, যিনি কেবল সাহিত্যিক সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং তাঁর রচনাগুলোর মাধ্যমে সমাজ ও রাজনীতির পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। তিনি ছিলেন বিদ্রোহী, মানবতাবাদী এবং সাম্যবাদী চিন্তাধারার এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তাঁর সাহিত্য, গান ও বক্তৃতায় শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, নারীর প্রতি বৈষম্য এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ পেয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর সাহিত্য ও কর্মের মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা “বিদ্রোহী” (১৯২২) উপনিবেশবাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক অনন্য দলিল। তিনি ব্রিটিশ শাসনের নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিলেন এবং তাঁর সাহিত্য জনগণের মাঝে চেতনা ছড়িয়ে দেয়। তাঁর “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতায় তিনি ব্রিটিশদের তুলনা করেছেন অত্যাচারী শক্তির সঙ্গে এবং ভারতকে মায়েরূপে কল্পনা করে ব্রিটিশ শাসকদের নির্মমতার চিত্র এঁকেছেন। এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে। নজরুল কেবল কলম দিয়েই নয়, তরুণ বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯১৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং সামরিক জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটান। বিপ্লবের ডাক দিয়ে তিনি লিখেছিলেন “চল্ চল্ চল্”, যা পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রণসঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তাঁর বিভিন্ন গান ও কবিতায় তিনি যুবসমাজকে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছেন। নজরুল ইসলাম ছিলেন মেহনতি মানুষের কবি। তিনি সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং সমাজতন্ত্রের আদর্শকে সমর্থন করতেন। তাঁর কবিতা “দুর্দিনের যাত্রী”, “কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” ও “সমবেত বিদ্রোহী রণধ্বনি” তে তিনি শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন।
তিনি বলেছিলেন
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
এই চেতনা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতিফলন। তিনি মনে করতেন, শ্রমিক, কৃষক ও নিম্নবর্গের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা উচিত।
নজরুলের সমাজ সংস্কারমূলক ভাবনা : কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি শুধু কবি বা সাহিত্যিকই ছিলেন না, বরং ছিলেন এক সমাজচিন্তক ও সংস্কারক। তাঁর সাহিত্য, কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও উপন্যাসের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজ পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি শুধু রাজনৈতিক বিদ্রোহেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার, অসাম্য, নারীর প্রতি বৈষম্য, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। নজরুলের সাহিত্যিক কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়, যেখানে তিনি সমকালীন সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক ভাবনা মূলত মানবতাবাদ, সাম্য, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এই প্রবন্ধে তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হবে। নজরুলের সমাজ সংস্কারমূলক ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাম্য ও মানবতা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজে কেউ ছোট-বড় নয়, ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত পরিচয় মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়, বরং মানবতাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
তিনি বলেছিলেন-
গাহি সাম্যের গান,
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
এই পংক্তির মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেছেন যে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। তিনি সমাজের ধনী-গরিব, জাত-পাতের বিভেদকে অস্বীকার করেছেন এবং প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকারের কথা বলেছেন।
তাঁর কবিতা ও গানে বারবার ফুটে উঠেছে সামাজিক সাম্যের চেতনা। “সাম্যবাদী” কবিতায় তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন
আমি সেই দিন হবো শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল
আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ
ভীম রণভূমে রণিবে না!
এই কবিতায় তিনি সমাজের সব শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে শোষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রতিভূ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্য, বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য নয়। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন এবং তাঁর লেখায় উভয় ধর্মের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
তিনি লিখেছিলেন-
মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান,

হিন্দু আর মুসলমান, মুসলমান আর হিন্দু,
এই সত্য জেনে গিয়েছে বিশ্ব, জানে ভারত-ভূ।
এই ধরনের বক্তব্য ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তিনি বারবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলতেন, ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানবতার সেবা, কিন্তু সমাজে এটি প্রায়ই ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়। “ধর্ম ও মানবতা” শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেছেন-
মানুষের কল্যাণই যদি ধর্ম না হয়, তবে সে ধর্ম ধর্ম নয়—সেটা অধর্ম।
তাঁর রচিত গজল, শ্যামাসংগীত ও হামদ-নাতের মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় সংগীতের এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন, যা আজও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির উজ্জ্বল উদাহরণ।
নারী মুক্তি ও নারীর অধিকারের পক্ষে তাঁর অবস্থান
নজরুল ছিলেন নারীর অধিকারের অন্যতম শক্তিশালী প্রবক্তা। তিনি মনে করতেন যে সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকা উচিত এবং নারীকে অবদমিত রেখে সমাজ কখনো উন্নত হতে পারে না।
তাঁর কবিতায় নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সমতার ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে। “নারী” কবিতায় তিনি লিখেছেন-
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
তিনি নারীর স্বাধীনতার জন্য জোর দাবি তুলেছিলেন এবং নারীকে শুধু সংসারের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
“বিদ্রোহী নারী” কবিতায় তিনি নারীর শক্তি ও স্বাধীনতার কথা বলেছেন-
আমি চির বিদ্রোহিনী বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!
এছাড়াও, নজরুল কন্যাসন্তানকে অবহেলা করার প্রবণতার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর অনেক গান ও কবিতায় নারীর প্রতি সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এসেছে।
নজরুল ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর। তিনি কৃষক, শ্রমিক, মজুর, দারিদ্র্যপীড়িত সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন এবং তাঁদের অধিকার আদায়ের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

তাঁর কবিতা “দুর্দিনের যাত্রী”, “কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” ও “সাম্যবাদী” তে তিনি সমাজের বঞ্চিত শ্রেণির দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি লিখেছেন-
ওরে চাষী, জাগরে তোরা!
মাটির বুকের প্রাণের ধন
লুটেরারা লুটে খায়!
ওরে মজুর, কুলি, মাল্লা,
সকল শোষিত, নিপীড়িত, নিঃস্ব জাতি
জেগে ওঠো! লও শক্তি হাতে!
এই কথাগুলো প্রমাণ করে যে তিনি শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য সাহিত্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
নজরুল এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে কোনো জাতিভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, লিঙ্গবৈষম্য কিংবা অর্থনৈতিক শোষণ থাকবে না। তিনি সমাজের সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং একটি মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি ঘোষণা করেছেন-
দেখিনু সেদিন রেলে
কুলি বলে এক বাবু বসাতে চায়নি সাথে
কহিলাম আমি, আছে নাকি মোর চামড়া তার চেয়ে খাঁটি?
এই ধরনের সাহিত্যকর্ম তাঁর সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক
কাজী নজরুল ইসলামের সমাজ সংস্কারমূলক ভাবনা কেবল তাঁর সময়ের জন্য নয়, বরং আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি মানবতার কবি, যিনি অন্যায়, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন।
তাঁর সাহিত্য আমাদের শিখিয়েছেন-
সাম্যের জন্য লড়াই করা উচিত
ধর্মকে বিভেদ নয়, ঐক্যের মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত
নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন
শ্রমিক ও কৃষকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি

তাঁর আদর্শ আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। সমাজকে বদলাতে হলে নজরুলের মতো বিদ্রোহী মনোভাব ধারণ করাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধার প্রকাশ।
কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক ও সমাজ সংস্কারমূলক ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর সাহিত্য, কবিতা ও গান আমাদের স্বাধীনতা, সাম্য, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়ের জন্য সংগ্রামের শিক্ষা দেয়। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন এক সমাজচেতক, যিনি নিজের কলমকে অস্ত্র বানিয়ে শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। নজরুলের ভাবনা আমাদের বর্তমান সমাজেও আলো ছড়ায়। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করলেই আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, চাঁদপুর।

কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ
কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

কুড়িগ্রামে শীত ও ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারদিক। গত কয়েক দিন থেকে আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও নেই উত্তাপ।হাসপাতাল গুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সোমবার (১২জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এদিকে কুয়াশা ও শীতের তীব্রতার সঙ্গে উত্তরীয় হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। হাসপাতালে আসা চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের জোড়গাছ এলাকার খলিল মিয়া বলেন, আমার ছেলের কয়েক দিন থেকে ডায়েরি তাই ভর্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পৌর শহরের কলেজ পাড়া এলাকার হোটেল শ্রমিক জাহিদ মিয়া বলেন, সকাল বেলা ঠান্ডা ও শীতে বাড়িত থাকি বের হওয়া যায় না। কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়, দুস্থ মানুষদের মধ্যে কম্বল বিতরণ চলমান রয়েছে। রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, সোমবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই জারি করা হয়েছে এ সতর্কতা। ইসরায়েলের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মধ্যে টেলিফোনে বৈঠক হয়েছে। মূলত ইরান পরিস্থিতিই ছিল সেই ফোনালাপের একমাত্র বিষয়বস্তু। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে নেতানিয়াহু-রুবিওর আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে রুবিওর সঙ্গে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগের দিন শুক্রবার মার্কিন দৈনিক দ্য ইকোনমিস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে ইরান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, “আমার মনে হয় কোনো ধারণাগত মন্তব্য না করে আমাদের উচিত হবে ইরানে কী ঘটছে, তা দেখা। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলন বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ। এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার এবং গতকাল শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিযাত শাখা ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে নামানো হয়েছে। শনিবার রাতে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি।
তবে ইরানের চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুন মাসে ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। টানা ১২ দিন সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল সেবার।

লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

রায়পুরসহ লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের অভিযান থাকলেও ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় থামছে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৫টায় রায়পুর শহরের প্রধান সড়কে তিনটি ও সদরের দক্ষিণ বাজারের গোডাউন এলাকায় ৪টি অভিযানে সাতটি মামলায় মোট দশ ডিলারকে ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।পৃথক এই অভিযান পরিচালনা করেন রায়পুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন ও নিরুপম মজুমদার। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্যে সরকারি দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। গৃহিণী আফসানা বলেন, ‘টিভিতে দামের ঘোষণা শুনি, কিন্তু দোকানে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না।’ ক্রেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়ে হলেও সহজে গ্যাস পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।’ খুশবু আক্তার বলেন, ‘তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নিতে বাধ্য করছে।’
পরিবেশক মোহাম্মদ কাজল ও ফাহিম বলেন, ‘গোডাউনে চাহিদার চেয়ে মাল কম। কোম্পানি থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বাজারে দাম বাড়ানো বাধ্যতামূলক।’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামসুল বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে।’ রায়পুর উপজেলা পরিষদের সামনে পিঠা বিক্রেতা আরিফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দৈনিক দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে।’
ওমেরা ও যমুনা এলপিজির পরিবেশক বেলাল হোসেন বলেন, ‘ওমেরা ও যমুনা কোম্পানির কোনও সংকট নেই। পাইকারি দামে ১৩৮০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি দামের চেয়ে বেশি কেনা হচ্ছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর শহরের ৭ জনকে ৪২ হাজার ও রায়পুর শহরের ৩ জন ব্যাবসায়ীকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নিই। অভিযোগ পেলে জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, না হলে সিন্ডিকেট ভাঙ্গা কঠিন হবে।’
রায়পুর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লুধুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এলপিজি বাজারের অনিয়ম উদ্বেগজনক। সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি ও ভোক্তাদের সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। না হলে নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।’
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাছান বলেন, লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ও সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এলপিজি-এর সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কালে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে সদরে ৭টি মামলায় ৪২ হাজার টাকা এবং রায়পুরে তিন মামলায় ১১ হাজার টাকা অর্থদন্ড আদায় করা হয়েছে। জনস্বার্থে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রুখতে জেলা প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি ও অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।