খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

সন্ত্রাসীদের প্রতি আর মানবিকতা নয় : সিইসি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:১১ অপরাহ্ণ
সন্ত্রাসীদের প্রতি আর মানবিকতা নয় : সিইসি

নির্বাচনের আগে সহিংসতা ও চোরাগোপ্তা হামলার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা মানবিক হব, কিন্তু যারা ভাংচুর, সহিংসতা, হত্যা করে, তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার দরকার নেই। নির্বাচনের আগে সহিংসতা ও চোরাগোপ্তা হামলার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা মানবিক হব, কিন্তু যারা ভাংচুর, সহিংসতা, হত্যা করে, তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার দরকার নেই। মেসেজ ইজ ভেরি ক্লিয়ার।’
গতকাল সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক এবং আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সভার পর সন্ধ্যায় নির্বাচন ভবন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দলের ভেতরে, একাধিক দলের মাঝে ঝুটঝামেলা এগুলো আছে। কিন্তু সার্বিকভাবে যদি আমরা বলি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই আছে।’ গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে যান। তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন।
পরে বিকালে নির্বাচন সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম রোধে যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে ইসিতে বৈঠক হয়। এতে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, তিন বাহিনী প্রধানদের উপযুক্ত প্রতিনিধি, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার ও ভিডিপি, ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি ও র‍্যাবের মহাপরিচালক, এসবি ও সিআইডির অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক অংশ নেন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। সভায় ইসি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাছে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত নাশকতার ঘটনাগুলোর বিষয়ে জানতে চায়। তাদের জানানো হয়, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
এ দুটি বৈঠকের পর বিভিন্ন বাহিনীর প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে আসেন নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ। ব্রিফিংয়ে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘গত বছরের আগস্টের পর থেকে মানবিক পুলিশিংয়ের নির্দেশনা ছিল। সেই মানবিকতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ সহিংসতা চালিয়েছে। যারা মানবিক, তাদের প্রতি মানবিকতা থাকবে। কিন্তু যারা ভাংচুর, হত্যা করে, সেসব সন্ত্রাসীর প্রতি মানবিক হওয়ার দরকার নেই। মেসেজ ইজ ভেরি ক্লিয়ার।’
সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কমিশনকে জানিয়েছে বলে জানান তিনি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে সানাউল্লাহ বলেন, ‘তারা এসব কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেনি, বরং বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তবে যারা জড়িত, তারা যে পরিচয়ই ধারণ করুক না কেন, আইনের আওতায় আনা হবে।’ নির্বাচন কমিশন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করতে চাইলেও ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড তাতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলে মনে করে ইসি। সানাউল্লাহ বলেন, ‘যারা আমাদের উৎসবকে বিঘ্নিত করতে চান, তারা ব্যর্থ হবেন। উৎসবের পরিবেশ ফেরত আসবে।’
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনা পরোক্ষভাবে নির্বাচনী পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে স্বীকার করছে ইসি। সানাউল্লাহ বলেন, ‘বৃহত্তর আবেগ ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে দুষ্টচক্র যে কাজটি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে মর্মে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে ২০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আশা হয়েছে মর্মে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।’ ময়মনসিংহে একজনকে পুড়িয়ে হত্যা নিয়ে এ নির্বাচন কমিশনার জানান, তারা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ করছেন। জনমনে যাতে স্বস্তি ফেরত আসে, মানুষ যাতে আশ্বস্ত হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো যাতে যথাযথভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে, সেজন্য ইসি বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি তফসিল অনুযায়ী দল ও প্রার্থী যাতে নির্বিঘ্নে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেন, সে নির্দেশনা বাহিনীগুলোকে দেয়া হয়েছে।
ইসি সানাউল্লাহ জানান, ‘নির্বাচনে সেনাবাহিনী এক লাখ সদস্য মোতায়েন করবে। এর এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে মাঠে রয়েছে। বাকিরা ধাপে ধাপে নির্বাচনের আগেই মোতায়েন হবে।’ তিনি আরো জানান, যৌথ বাহিনীর ‘ডেভিল হান্ট’ নামের বিশেষ অভিযান চলছে। এ অভিযানে ১৩ ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার সন্ত্রাসী গ্রেফতার হচ্ছে। একটি বাহিনী ৫৬টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। অবৈধ মোটরসাইকেলসহ হাজার হাজার যানবাহন চেক করে মামলা দেয়া হয়েছে। সন্ত্রাসীদের জামিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আইন উপদেষ্টা এরই মধ্যেই বলেছেন, সন্ত্রাসীরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে, এটা নিয়ে উদ্বেগ আছে। তবে আদালতের বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারি না। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে তুলে দেয়া।’

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।