খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়

প্রকল্পের সঙ্গে জলে গেছে ২৭ কোটি, ফের বরাদ্দ ৫০ কোটি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
প্রকল্পের সঙ্গে জলে গেছে ২৭ কোটি, ফের বরাদ্দ ৫০ কোটি

রাজধানীর গুলশানের উত্তর বারিধারার আট বিঘা জমিতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের নামে চলছে বিপুল অর্থের অপচয়। প্রথমে প্রবাসীদের জন্য কিডনি হাসপাতাল ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনা চলে। পরে হাউজিং প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগে কেটেছে দুই দশকের বেশি সময়। সেখান থেকে সরে মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আবারও ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডরমিটরি এবং একটি কমার্শিয়াল ভবন নির্মাণের মহাপরিকল্পনা নেয়। আড়াই দশকে এসব কর্মকাণ্ডে সাড়ে ২৭ কোটি টাকা খরচ হলেও কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি।
প্রকল্পের জন্য গুলশানের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই তড়িঘড়ি করে পিপিআরের আইন ভেঙে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ২০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। গত জুলাই থেকে আগামী ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ। এই হাসপাতাল পরিচালনায় বোর্ডের আইন ভঙ্গ করেই বোর্ড সভা এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়েই গঠন করা হচ্ছে কোম্পানি। এতেই কল্যাণ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে প্রবাসীদের বিনিয়োগে হাসপাতাল নির্মাণে তাদের কোনো উপকারে আসবে না। এ ছাড়া সেবাধর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোম্পানি গঠনে জটিলতা তৈরি হবে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে গুলশান-ভাটারার (উত্তর বারিধারা) প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবাসীদের কল্যাণে কিডনি হাসপাতাল এবং তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য ১৫১ দশমিক ৫৪ কাঠা জমি ক্রয় করা হয়। পরবর্তী সময়ে বোর্ড সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এখানে প্রবাসীদের জন্য ৫০০ ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে চাইলে আরও ১৫ দশমিক ৭৪ কাঠা জমি ক্রয় করা হয়। বর্তমানে এই জমির মূল্য ৬০০ কোটি টাকারও বেশি।
হাউজিং প্রকল্পে ছয়টি ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে কল্যাণ বোর্ড ২০০৪ সালে দুই হাউজিং কোম্পানিকে কার্যাদেশ প্রদান করে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠান দুটি বেজমেন্টসহ একটি ভবনের লেভেল-২ পর্যন্ত,  অন্য একটি ভবনের লেভেল-৪ পর্যন্ত ফ্রেম স্ট্রাকচারের নির্মাণকাজ এবং পুরো জমিতে পাঁচটি ভবনের পাইলিং করার পর নির্মাণ মূল্য বৃদ্ধির জন্য আবেদন করে। এই জটিলতায় ২৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় করে কাজ অসমাপ্ত করে ২০২০ সালে প্রকল্প বন্ধ করে সরকার।
এর মধ্যে গত ১৭ এপ্রিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রবাসীদের পরিবারের এক অনুষ্ঠানে বারিধারার জায়গাটিতে নতুন করে হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেন। নতুন এই প্রকল্পে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকবে এবং ৪৯ শতাংশ শেয়ার হবে প্রবাসীদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে কল্যাণ বোর্ড উপদেষ্টার ঘোষণা বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই আট বিঘা জমিতে নিজস্ব অর্থায়নে ৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) নির্মাণ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
গত ২৬ আগস্ট ৩৩৪তম বোর্ড সভায় মন্ত্রণালয়ের এসব কোনো মতামত গ্রহণ না করেই প্রকল্পটি অনুমোদন এবং ৩১ আগস্ট প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব আর্থিক অনুমোদনও দেন। তবে প্রকল্প প্রণয়নে কোনো ধরনের সমীক্ষা এবং নতুন করে মাস্টারপ্ল্যানও করা হয়নি। কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ কমিটি ছাড়াই প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করেছেন কল্যাণ বোর্ডের অর্থ, বাজেট ও কল্যাণ পরিচালক ড. এটিএম মাহবুব-উল করিম, ভূসম্পত্তি ব্যবস্থাপনার সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান, প্রশাসন ও সেবা সহকারী পরিচালক নাজমুল হক এবং বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী আবু শাহাদাত মো. শরীফ।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রবাসীকল্যাণ হাসপাতাল পরিচালনার জন্য এর মধ্যেই বোর্ড এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই প্রবাসীকল্যাণ সার্ভিস পিএলসি নামে একটি কোম্পানির ছাড়পত্র গ্রহণ করেছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, যা বোর্ড আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, বারিধারার জায়গাটি অবস্থানগত কারণে অনেক মূল্যবান। সেখানে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ৩০০ শয্যার হাসপাতাল না করে মাত্র ২০ শয্যার হাসপাতাল করাটা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত না।
প্রবাসীকল্যাণ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থ ও বাজেট এবং কল্যাণ পরিচালক ড. এটিএম মাহবুব-উল করিম বলেন, উপদেষ্টা প্রবাসীদের জন্য একটি হাসপাতাল দ্রুত নির্মাণের নির্দেশনা ছিল। সেখানে বোর্ডের সঙ্গে প্রবাসীরাও শেয়ারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করবেন। এই নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যই প্রথম পর্যায়ে মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের সবাই মিলে প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে। আগের মাস্টারপ্ল্যানের ৩০০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং মাস্টারপ্ল্যান কিছুটা অনুসরণ করা হবে, তবে সম্পূর্ণটা না।
ডিপিপি প্রস্তুতে ভূসম্পত্তি ব্যবস্থাপনার সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান, প্রশাসন ও সেবা সহকারী পরিচালক নাজমুল হক এবং বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী আবু শাহাদাত মো. শরীফ জানান, এ ধরনের প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নে আমাদের অভিজ্ঞতা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় আমরা ডিপিপির কাঠামো দেখে এ প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করেছি। ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ব্যারিস্টার গোলাম সারোয়ার ভূঁইয়া বলেন, আপাতত ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প শুরু হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি দুই হাজার কোটিতে দাঁড়াবে।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। ২০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করা হচ্ছে কিনা, জানি না। এটি বোর্ডের চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন।
প্রকল্প সম্পর্কে জানতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে একাধিকবার কল ও মেসেজ দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি বুধবার দপ্তরে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।