খুঁজুন
                               
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৪ বৈশাখ, ১৪৩৩

পদত্যাগের আলোচনায় ইউনূস কী করবেন, সেদিকে দৃষ্টি দেশবাসীর

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ মে, ২০২৫, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
পদত্যাগের আলোচনায় ইউনূস কী করবেন, সেদিকে দৃষ্টি দেশবাসীর

ক্ষোভ ও হতাশা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করতে চাইছেন, এমন খবর তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সারাদেশে। এ নিয়ে বিএনপিসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অধ্যাপক ইউনূস পদত্যাগ করুন, কোনো দলই সেটা চায় না। তবে দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় চায়।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠক শেষে অনির্ধারিত আলোচনায় তাঁর পদত্যাগের ভাবনার কথা বলেন। জানা যায়, এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা বলেন। প্রায়ই সড়ক আটকে আন্দোলন, সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়া, রাষ্ট্রীয় কাজে নানা পক্ষের অসহযোগিতাসহ দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি। অধ্যাপক ইউনূসের পদত্যাগের ভাবনার কথা জানাজানি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। এর আগের দিন বুধবার ঢাকা সেনানিবাসে ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কিছু বক্তব্য জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। তাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান, তার মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠাসহ জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য ছিল।

এর পরদিনই অধ্যাপক ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে চান, এই আলোচনা আসে। এটাকে বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকে কৌশলগত ‘হুমকি’ কি না, সেটিও বিবেচনায় নিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে। অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা তো ওনার (প্রধান উপদেষ্টা) পদত্যাগ চাই না। আমরা নির্বাচনের রোডম্যাপ চেয়েছি। তিনি কেন সেদিকে যাচ্ছেন না, সেটা আমরা জানি না। এরপরও তিনি যদি দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে জাতি নিশ্চয়ই বিকল্প বেছে নেবে। কারণ, এটা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যাপার।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি কী ভূমিকা নেয়, রাজনীতি–সচেতন ব্যক্তিরা সে দিকেই দৃষ্টি রাখছেন। তবে বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়েছে, তাতে সম্ভাব্য সংকট বা অনিশ্চয়তা নিরসনে দলগুলোর মধ্যে একধরনের ঐকমত্য হয়েছে বলে জানা গেছে। সেটি হচ্ছে, তাঁরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে পদত্যাগ না করতে অনুরোধ করবেন।

এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বা সরকারের বিভিন্ন কাজে যুক্ত এমন কেউ কেউ এরই মধ্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক কথা বলেছেন। সবার মধ্যে একটা ঐকমত্য হয় যে অধ্যাপক ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকুন। তবে তাঁকে দ্রুত নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট পথনকশা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করতে হবে। এ ছাড়া সরকারের একজন উপদেষ্টাকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও অনেকে আলোচনায় এনেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, তাঁরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চান। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাঁরা পথনকশা চেয়ে আসছেন। নির্বাচনের পথনকশা দিলে অনেক সংকটের সমাধান হয়ে যায়। এ বিষয়ে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার রাতে বলেন, ‘আমরা দেশের স্থিতিশীলতা চাই। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। এর জন্য নির্বাচনের রোডম্যাপ চাওয়া কি অপরাধ? এখনকার পরিস্থিতিতে আমি বলব, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক, সবার ধৈর্য ধরা উচিত। বিশেষ করে সরকারের।’

বিএনপি সূত্র থেকে জানা যায়, এর আগে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ চেয়ে গত মঙ্গলবার তাঁর কার্যালয়ে বার্তা পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত কোনো সাড়া না পেয়ে বিএনপি জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ তিন উপদেষ্টার অব্যাহতি চায়। এরপর রাতে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা–সংক্রান্ত খবর ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেতে থাকে। প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে চান, এ খবর জানাজানির পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হয়। গত রাতে সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, বিএনপিকে আজ শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সাক্ষাতের সময় দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বৃহস্পতিবার রাতেই এক বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার আহ্বান জানান। জামায়াত নেতা গতকাল বেলা ১১টায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় যান। তবে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ পাননি; আজ সন্ধ্যা ছয়টায় জামায়াতের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েব আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গত রাতে বলেন, ‘আমরা মনে করি, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বেই আগামী জাতীয় নির্বাচন হওয়াটা অনিবার্য। তিনি যদি পদত্যাগ করেন, তাতে যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা একেবারেই অনিশ্চিত। তাই এ ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হোক, কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকের কাম্য হতে পারে না।’

অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও চায় বিভাজন কাটিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হোক। সে লক্ষ্যে গতকাল এক বিবৃতিতে অবিলম্বে বিচার-সংস্কার-নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন। অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিপিবি। দলটির নেতারা গতকাল পল্টনে এক সমাবেশে বলেছেন, ‘সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন সংস্কার করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করুন।’

অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে ফেলে দাবিদাওয়া আদায়ের রাজনীতি ও পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীম। সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকট ও জটিল পরিস্থিতিতে অধ্যাপক ইউনূসের পদত্যাগ নয়; বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষকে সমঝোতামূলক সমাধানে পৌঁছার আহ্বান জানিয়েছে এবি পার্টি।

ইসলামি দলগুলোতে ঐকমত্য

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধ্যাপক ইউনূসের পদত্যাগের ভাবনা এখনো আগের পর্যায়ে রয়েছে। এ নিয়ে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরাসহ বিভিন্ন মহল চিন্তিত। এর মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের দল এনসিপির নেতারা বৃহস্পতিবার রাতেই অন্যান্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। ওই রাতেই বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতার সঙ্গে এনসিপিসহ আরও কয়েকটি দলের নেতাদের অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়।

এ ছাড়া জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ও ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীমের মধ্যেও ফোনে কথা হয় বলে জানা গেছে। আবার ইসলামী আন্দোলনের কার্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ পাঁচটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সৈয়দ রেজাউল করীম। সেখানে উপস্থিত ছিলেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক, এবি পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, সারোয়ার তুষার প্রমুখ।

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা আছে, তিনি প্রত্যাশাও তৈরি করেছেন। এখন তিনি চাইলেই একটা রাষ্ট্রকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে চলে যেতে পারেন না। এটা ক্ষোভ-অভিমানের জায়গা না। তবে কেউ তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করলে বা চাপ প্রয়োগ করলে সেটা জনগণ দেখবে, রাজনৈতিক দলগুলো দেখবে। এ ছাড়া জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যেও দ্রুত যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তারা মনে করে, অধ্যাপক ইউনূস পদত্যাগ করলে দেশে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, এই মুহূর্তে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য, চলমান সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার জন্য এবং দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ বড় ধরনের সংকটের তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘তাই আমরা যার যার জায়গা থেকে অনুরোধ করছি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার। তবে নির্বাচনে স্পষ্ট রোডম্যাপ দেওয়ার জন্য তাঁর প্রতি আহ্বান করব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে বলব, নিজ নিজ জায়গায় অনড় না থাকতে। অন্যথায় দেশ খুব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

ইউনূসের নেতৃত্বেই সংস্কার ও নির্বাচন চায় এনসিপি

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেই রাষ্ট্রের সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় এনসিপি। অধ্যাপক ইউনূসের পদত্যাগের আলোচনা ওঠার পর দলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলেছে। এনসিপির নেতাদের ধারণা, প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকার জন্য অধ্যাপক ইউনূসকে যদি বিএনপিসহ বিভিন্ন দল অনুরোধ না করে, তিনি পদত্যাগ করার সম্ভাবনা বেশি। সে ক্ষেত্রে তাঁকে রাখতে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীসহ বিপুল মানুষ রাস্তায় নেমে আসবেন।

গতকাল এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের চারজন নেতার সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তাঁরা জানান, অধ্যাপক ইউনূস বেশ কিছু কারণে বিরক্ত। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দূরত্ব ও সেনাপ্রধানের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আগ বাড়িয়ে কথা বলা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্তিতে প্রতিক্রিয়া, বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র পদে বসানোর দাবির আন্দোলন যমুনা পর্যন্ত চলে আসা এবং সম্প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য অন্যতম। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেই জুলাই গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে, সেটাই আমরা দেখতে চাই।’

দৃষ্টি আজকের একনেকের বৈঠকে

এদিকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক রয়েছে আজ। প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এ সভা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারাও থাকেন। এই সভায় অধ্যাপক ইউনূস উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলেন কি না; সেদিকেও রাজনীতিকদের দৃষ্টি রয়েছে। সূত্র : প্রথম আলো।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।