খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

সমাজসেবা ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ায় রোটারীর ভূমিকা অপরিসীম : ইশতিয়াক এ জামান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৫, ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
সমাজসেবা ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ায় রোটারীর ভূমিকা অপরিসীম : ইশতিয়াক এ জামান

বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে চাঁদপুর সেন্ট্রাল রোটারী ক্লাবের ৩৫তম অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে । শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় (১৮ জানুয়ারি ২০২৫) চাঁদপুর ক্লাবের মুক্তমঞ্চে ২০২৪-২০২৫ সালের ক্লাব কমিটির এই অভিষেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন রোটারী বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর পিডিজি ইশতিয়াক এ জামান, পিএইচডি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ও মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আব্দুর রকিব পিপিএম।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রোটারী বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর পিডিজি ইশতিয়াক এ জামান, পিএইচডি তাঁর বক্তব্যে বলেন, আজ চাঁদপুর সেন্ট্রাল রোটারী ক্লাব অনেকগুলো ভালো কাজ করেছে। রোটারিয়ানরা সবসময় সমাজের জন্যে ভালো কাজ করে। বিশ্বে পোলিও নির্মূল করাসহ অনেক কাজ রোটারীর মাধ্যমে হয়েছে। আমার দেখা মতে চাঁদপুর সেন্ট্রাল রোটারী ক্লাবের এই অভিষেক অনুষ্ঠানটি হলো সেরা একটি অনুষ্ঠান। যা উদাহরণ দেয়ার মতো। চাঁদপুর সেন্ট্রাল রোটারী ক্লাব সুক্ষ্মভাবে সমাজ থেকে মেধাবী লোক খুঁজে খুঁজে তাদের স্ব স্ব পেশায় সমাজে অবদান রাখার জন্য যে সম্মাননা দিয়েছে সত্যি রীতিমত অভিভূত হয়েছি। আমার বাবা একজন রোটারিয়ান ছিলেন। আমি রোটারীতে দ্বিতীয় প্রজন্ম। চাঁদপুর সেন্ট্রাল রোটারি ক্লাবের যেমন ৩৫তম বছর, আমারও রোটারীর ৩৫ বছর। আমি ঢাকা রোটারী ক্লাবের সদস্য।

তিনি আরো বলেন, ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর রোটারিতে ব্যাপক পরিবর্তন ও সংস্কার হচ্ছে। আমরা রোটারীর মাধ্যমে রোটারী ইন্টারন্যাশনালে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবো। কারন আমাদের দেশে যারা রোটারী করে তাদের মধ্যে শতকরা ৯৯.৯৯% হলো ভালো মানুষ। আমার টার্গেট হলো পরবর্তী রোটারী ইন্টারন্যাশনাল মিটিংয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে যাতে ভালো ধারনােউপস্থাপন করা। ব্যবসায়িক ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে উঠা রোটারী হলো বিশ্বব্যাপী সেবামূলক সংগঠন। উচ্চস্তরের মানদণ্ড, সমাজসেবা ও আন্তর্জাতিক বোঝা পড়ায় এ সংগঠনের ভূমিকা অপরিসীম। শিকাগোর মার্কিন অ্যাটর্নি পল পি. হ্যারিস ১৯০৫ সালে এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন যা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানরূপে স্বীকৃত। প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, ব্যবসায় ও পেশাদারী পর্যায়ে উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ গঠন এবং বিশ্বব্যাপী ফেলোশীপ প্রদানের মহান ব্রত নিয়ে আদর্শ সেবা প্রদানকল্পে এ সংগঠনটি গঠিত হয়। রোটারী গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমি সবাইকে নিয়ে এক সাথে কাজ করতে চাই। যখন যে খানে মিটিং এর আয়োজন করা হয় অবশ্যই আপনারা আসবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব পিপিএম। আরো উপস্থিত ছিলেন রোটাঃ অ্যাড. ইকবাল বিন বাশার, চাঁদপুর চেম্বার অব কর্মাস এর সিনিয়র সহ-সভাপতি রোটা. পিপি সুভাস চন্দ্র রায়, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রোটা. পিপি তমাল কুমার ঘোষ, জোনাল কো-অর্ডিনেটর রোটা. অধ্যাপক জাকির হোসেন, রোটা. নূরুল আমিন খান আকাশ, রোটা. শাহেদুল হক মোর্শেদ, চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের সাবেক সভাপতি রোটা. মঞ্জুরুল কাদের সোহেল, রোটা. নাসির উদ্দিন খান, সভাপতি রোটা. নজরুল ইসলাম, প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট রোটা. মো. মোস্তফা, সহ-সভাপতি রোটা. উজ্জ্বল হোসাইন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ২০২৩-২৪ রোটা বর্ষের প্রেসিডেন্ট রোটাঃ ইমরান হোসেনের সঞ্চালনায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন দৈনিক প্রভাতী কাগজের প্রকাশক ও সম্পাদক রোটা. আবদুল আউয়াল রুবেল পিএইচএফ, গীতা পাঠ করেন রোটা. জয়ন্তী ভৌমিক। এরপর জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অভিষেক অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের প্রোগ্রাম চেয়ারম্যান ছিলেন রোটা. পিপি শেখ মনির হোসেন বাবুল আরএফএসএম। রোটারী প্রত্যয় পাঠ করেন রোটাঃ ডাঃ পীযুষ সাহা।

রোটারী ২০২৩-২৪ রোটা বর্ষের কার্যবিবরনী তুলে ধরেন ক্লাব সেক্রেটারী রোটা. রেশেদা আক্তার। ২০২৩-২৪ রোটা বর্ষের প্রেসিডেন্ট রোটা. ইমরান হোসেন, ২০২৪-২৫ রোটা বর্ষের প্রেসিডেন্ট রোটা. ডা. ইফতেখারুল আলম ও সেক্রেটারী রোটা. আবু ইউসুফ তালুকদার মানিকেরর কলার হস্তান্তর করেন। নবাগত প্রেসিডেন্ট রোটাঃ ডাঃ ইফতেখারুল আলম ক্লাব সদস্যদের পরিচয় তুলে ধরেন।

চলতি রোটা বর্ষে ক্লাব সদস্যরা তাদের স্ব স্ব পেশায় বিশেষ অবদানের জন্য ৮ জন সদস্যকে প্রধান অতিথির হাত থেকে সম্মাননা ক্রেষ্ট দেয়া হয়। এছাড়াও সমাজের বিভিন্ন পেশায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য ৮ জন পেশাজীবীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। ৫ জন নতুন সদস্যকে চাঁদপুর সেন্ট্রাল বোটারী ক্লাবের মেম্বার করে প্রধান অতিথি পিন পরিয়ে দেন। এরা হলেন : চাঁদপুর জেলা জজ কোর্টের পিপি কোহিনুর বেগম, ফকরুল ইসলাম, ব্যবসায়ীএমএ লতিফ, অ্যাড. মিল্টন, ব্যবসায়ী এম সফিউল্লা।  চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতি ১০ জন গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। সকল আমন্ত্রিত অতিথি ও ক্লাব সদস্যরা নৈশভোজ করে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।