খুঁজুন
                               
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৪ বৈশাখ, ১৪৩৩

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বিশ্বকে কীভাবে প্রভাবিত করবে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৫, ৯:২২ অপরাহ্ণ
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বিশ্বকে কীভাবে প্রভাবিত করবে?

দ্বিতীয় বারের মত হোয়াইট হাউসে ফিরছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার আর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্টের শপথ নেবেন তিনি। মার্কিন মসনদে তার এই ফেরা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই তার ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মূলনীতি বাস্তবায়ন শুরু করবেন। ট্রাম্পের এই এজেন্ডা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির খুঁটিনাটি তো পরিবর্তন করবেই। পাশাপাশি এর ফলে আমেরিকার সীমানার বাইরে বসবাস করা কোটি মানুষের জীবনও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে।

প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হল এই নিবন্ধে।

• ইউক্রেন

নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিভিন্ন বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ‘একদিনের মধ্যে’ শেষ করতে পারবেন। যদিও সেটি ঠিক কীভাবে করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কখনই খোলাসা করেননি তিনি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যে কোটি কোটি ডলার সেনা অনুদান দিয়েছে, ট্রাম্প সবসময়ই সেটির কড়া সমালোচক ছিলেন। ইউক্রেন আর রাশিয়ায় ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসাবে নিয়োগ পেতে যাওয়া কিথ কেলোগও সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ১০০ দিনের মধ্যে এই যুদ্ধ থামানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।

ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার সাথে দেখা করতে চান এবং ট্রাম্পের সহযোগীরা ঐ বৈঠকের ‘প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।’
• ন্যাটো

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি-সহ ৩২টি দেশের সামরিক জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) বহুদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চক্ষুশূল। তিনি প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন হুমকি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহার করে নেবেন; যদি ন্যাটো সদস্যরা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিজ নিজ দেশের জিডিপির দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না করে।

সেসময় তিনি বলেছিলেন, কোনও দেশ যদি প্রতিরক্ষা খাতে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ ব্যয় না করে তাহলে তারা আক্রমণের শিকার হলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করবে না। চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুর দিকে ট্রাম্প ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের আহ্বান জানান, যেন তারা প্রতিরক্ষায় ব্যয় বাড়ায় এবং তাদের জাতীয় আয়ের পাঁচ শতাংশ প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ করে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ওয়েবসাইটের বর্ণনা অনুযায়ী, তার লক্ষ্য হলো ন্যাটোর উদ্দেশ্য ও মূলনীতির পুনর্মূল্যায়ন। যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোট থেকে তিনি কখনও সরিয়ে নেবেন কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের দ্বিমত আছে।

কিন্তু অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, জোটের সদস্য হিসাবে থেকেও ন্যাটোর প্রতি গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারেন ট্রাম্প। যেমন, ইউরোপে নিযুক্ত মার্কিন সেনার সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারেন তিনি।
• মধ্যপ্রাচ্য

ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরই প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে যোগ দিচ্ছেন। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে তাকে বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়েই যেতে হবে।

অর্থাৎ এই যুদ্ধ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করাটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য কঠিন হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ইসরায়েলের পক্ষে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে দাবি করা ও তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।

এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধেও তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাড়ায় ও ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে।

সমালোচকদের অনেকের মতে, ট্রাম্পের নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে ও এর ফলে ফিলিস্তিনিরা কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় আব্রাহাম অ্যাকর্ডের প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করেন এবং ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান আর মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চালান।

তবে ওই চুক্তিতে আরব দেশগুলোর শর্ত ছিল, ভবিষ্যতে ইসরায়েল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। যে শর্ত সেবারও মানা হয়নি। গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর ট্রাম্প বলেন, তিনি আব্রাহাম অ্যাকর্ডের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে ‘শক্তি প্রয়োগ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা’ করবেন।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর অর্থ সৌদি আরব আর ইসরায়েলের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করার চেষ্টা করবেন তিনি।
• চীন

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকাকালীন চীনের সাথে একপ্রকার বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এই দফায়ও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করবেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তিনি যাদের নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন; সেই মার্কো রুবিও ও মাইক ওয়াল্টজ চীনের প্রতি কঠোর মনোভাবসম্পন্ন বলে বিবেচনা করা হয়।

তারা দু’জন তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে এরই মধ্যে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তারা বেইজিংকে অন্যতম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন।

অন্যদিকে, তাইওয়ানও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ানকে সেনা সহায়তা দিয়ে এসেছে। যেখানে চীন তাইওয়ানকে দেখে এমন একটি অঞ্চল হিসাবে যেটি চীন থেকে বর্তমানে বিচ্ছিন্ন হলেও ভবিষ্যতে বেইজিংয়ের অধীনে থাকবে।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন যদি তাইওয়ান অবরোধ করার চেষ্টা করে তাহলে চীনের ওপর আরো কঠোর কর আরোপ করা হবে।
• জলবায়ু পরিবর্তন

নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণার বিরোধী হিসাবে পরিচিত। গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশ বান্ধব জ্বালানির ধারণাকে এর আগে ‘জালিয়াতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেবেন বলে মনে করেন অনেকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নেওয়া সিদ্ধান্ত বদলে জো বাইডেন ২০২১ সালে প্যারিস চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করেন।

আর ট্রাম্প আরও কম খরচে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেশি মাত্রায় কূপ খনন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তার নির্বাচনী প্রচারণায়। জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য হুমকিস্বরুপ।
• অভিবাসন

যথাযথ অনুমোদন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের এবারের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান অংশ। হোয়াইট হাউসে বসে প্রথম দিন থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ-বিতারিতকরণ কর্মসূচি শুরু করবেন।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই যে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব; অর্থাৎ জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের বিধান, সেই নীতিও পরিবর্তন করার লক্ষ্য আছে নতুন প্রেসিডেন্টের। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি এমনও মন্তব্য করেছিলেন, বেশ কিছু দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটকের আনাগোনাও নিষিদ্ধ করবেন তিনি।

এর অনেকগুলো দেশই ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
• গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খাল

গ্রিনল্যান্ড কিনতে চেয়ে ও পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাওয়ার মন্তব্য করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। আগের দফায় প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ও ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, এটি বিক্রি হবে না। ডেনমার্কের অধীনে থাকা গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিষয়ক কার্যক্রমের বড় ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়া ওই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদও রয়েছে; যা বিভিন্ন হাই-টেক যন্ত্রপাতি ও ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে, পণ্য ও মালামাল পরিবহনের পথ পানামা খাল অতিরিক্ত ব্যয়বহুল এবং এই পথ দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ না কমলে যুক্তরাষ্ট্র পানামা খালের দখল নিয়ে নেবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই দুই অঞ্চলের একটিরও নিয়ন্ত্রণ নেবে না। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য আর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মূলনীতির অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র তাদের সীমানার বাইরে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন চালিয়ে যাবে। বিবিসি বাংলা।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।