বৈশ্বিক জার্নাল : চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় প্রত্যাহার বাংলাদেশিদের গবেষণাপত্র

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ । ১:০৫ অপরাহ্ণ

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের একজন অধ্যাপকের নাম মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খান। তিনি নিজেকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষক বলেও দাবি করেন। অবশ্য কয়েকটি সুপরিচিত জার্নাল বা সাময়িকী মনিরুজ্জামানের ২৬টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছে। এসব গবেষণার ছয়টিতে তিনি মূল লেখক এবং বাকিগুলোতে সহলেখক ছিলেন। জার্নালগুলো বলছে, ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন যোগ করা, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তিসহ নানা অনিময়ের অভিযোগে গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহার করেছে তারা।
মনিরুজ্জামান খান শুধু একটি উদাহরণ। প্রথম আলো ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন সময়ে প্রত্যাহার হওয়া অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্রের খোঁজ পেয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষকের সংযুক্তি রয়েছে। বিশ্বের যেকোনো দেশের গবেষকদের ক্ষেত্রে গবেষণাপত্র জার্নাল বা সাময়িকীতে প্রকাশ করা বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক জগতের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। জার্নালে প্রকাশের মাধ্যমে গবেষক আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাজের মেধাস্বত্ব ও একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করেন। বিশ্বখ্যাত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ পেলে তা গবেষকদের মর্যাদা বাড়ায় এবং শিক্ষকতার ক্ষেত্রে পদোন্নতিতেও ভূমিকা রাখে।
গবেষকেরা বলছেন, কোনো দেশের একের পর এক গবেষকের গবেষণা প্রত্যাহার হলে তা ওই দেশের গবেষকদের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলে। নতুন গবেষণা সুপরিচিত জার্নালে প্রকাশ কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বজুড়ে একজন গবেষকের গবেষণার মান ও প্রভাব মূল্যায়ন করা হয় মূলত তাঁর কাজকে অন্য গবেষকেরা কতবার উদ্ধৃত (সাইটেশন) করেছেন, সেটার ভিত্তিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব (জিওলজি) বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদের প্রায় ৪৫০টি গবেষণা প্রায় ২০ হাজার বার উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একেকটি গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনা ফুটবল মাঠের একেকটি লাল কার্ডের মতো। বাংলাদেশিদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের সংখ্যা এখন উদ্বেগজনক।
কীভাবে খোঁজ
গবেষণাপত্রের বিষয়ে অভিযোগ উঠলে সাধারণত বিশ্বের বেশির ভাগ প্রকাশনা সংস্থা কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকসের (কোপ) নীতিমালা অনুসরণ করে সেটা সমাধান করে। কোপ একটি অলাভজনক সংস্থা, যা মূলত গবেষণাপত্রের নীতিগত মান এবং সততা বজায় রাখতে কাজ করে। প্রথমে প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদক অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করেন। প্রাথমিক প্রমাণ পেলে গবেষকের কাছে মূল তথ্য ও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে সাময়িকী বা প্রকাশক কর্তৃপক্ষ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে। জালিয়াতি গুরুতর হলে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের (রিট্রাকশন) ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব ঘোষণার খোঁজ রেখে তালিকা প্রকাশ করে রিট্রাকশন ওয়াচ নামের একটি ওয়েবসাইট। প্রত্যাহারকৃত বাংলাদেশি গবেষণার তথ্য সংগ্রহে রিট্রাকশন ওয়াচের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিজেরা ঘেঁটে এই ৩২৫টি গবেষণা পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, এটাই চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। আরও গবেষণা প্রত্যাহার হয়ে থাকতে পারে।
এই প্রতিবেদনে একই গবেষণাপত্রে একাধিক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বা গবেষকের নাম থাকলেও মোট হিসাবের ক্ষেত্রে সেটি একবার গণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে এলসেভিয়ার, স্প্রিঞ্জার নেচার, উইলি, হিন্দাউই, আইইইইর মতো জার্নাল থেকেই বেশি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহার করে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে সবচেয়ে বেশি এসেছে পিয়ার রিভিউ (বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন) প্রক্রিয়ায় কারচুপি, তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি, প্লেজিয়ারিজম (চৌর্যবৃত্তি), একই তথ্য পুনর্ব্যবহার এবং অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে সাইটেশন (উদ্ধৃতি-সংখ্যা) বাড়ানোর অভিযোগ। কিছু গবেষণায় অর্থের বিনিময়ে লেখকস্বত্ব বেচাকেনার বাণিজ্যিক চক্র জড়িত (পেপার মিলের) থাকার কথাও চিহ্নিত করেছেন প্রকাশকেরা। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ৩২৫টি গবেষণার মধ্যে ৪৪টিতে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ৪২টিতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ৩২টিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ২১টিতে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি (ইউআইইউ) এবং ২০টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নাম রয়েছে।
অন্যদিকে ১১টি করে গবেষণায় নাম আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (১০), নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১০), বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি (১০), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (৭), গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (৬) গবেষকেরাও রয়েছেন এই তালিকায়।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মনিরুজ্জামান খানের যেসব গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে, সেগুলো ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল। আর প্রত্যাহারের হয় ২০২৩ সালে। প্রত্যাহার হওয়া প্রতিটি গবেষণাপত্রেই সৌদি আরবের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সহলেখক হিসেবে ছিলেন।
বাংলাদেশি একাধিক গবেষক বলছেন, বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নতির জন্য সৌদি আরব গবেষকদের আর্থিক সুবিধা দিত। এতে বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা সৌদি আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে গবেষণা প্রকাশ শুরু করেন। যদিও গবেষণার মান বজায় রাখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে ২০২০ সালের পর থেকে সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়।
এদিকে ২৬টি গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনায় নিজের দায় অস্বীকার করে উল্টো প্রকাশকদের দায়ী করেছেন অধ্যাপক মনিরুজ্জামান। গত ২ জুলাই মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান শুরুতে নিজেকে বিশ্বসেরা গবেষকদের একজন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘একাধিক পর্যালোচকের মূল্যায়ন ও সংশোধনের পরই গবেষণাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল।’
গবেষণা প্রত্যাহারের সময় প্রকাশকেরা গবেষকদের বক্তব্য জানতে চান। তেমনটি হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা মতামত দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রকাশকেরা গুরুত্ব দেয়নি।’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেড় বছরের ব্যবধানে মনিরুজ্জামান ও তাঁর সহযোগী শিক্ষার্থীরা অন্তত ৮০টি গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। এত অল্প সময়ে কীভাবে এত গবেষণা প্রকাশ করা যায়, তা নিয়ে নিজের অনুষদে সন্দেহের মুখে পড়েছিলেন মনিরুজ্জামান।নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদপ্রধান অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসাইন গত ২ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতগুলো গবেষণা একসঙ্গে প্রকাশ হয়েছিল আন্তর্জাতিক প্রকাশনায়। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তখনই আমরা মনিরুজ্জামানকে সতর্ক করে দিই।’
যদিও এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো তদন্ত বা পদক্ষেপ নেয়নি। গবেষণা প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখক কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, সেটা উল্লেখ করতে হয়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত লেখকদের গবেষণা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী থেকে একের পর এক প্রত্যাহার হয়েছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত লেখকদের গবেষণা প্রত্যাহারের সংখ্যা ৪২। গবেষকদের কেউ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কেউ অতিথি গবেষক। প্রত্যাহৃত এসব গবেষণার আটটির সঙ্গে যুক্ত গবেষক মুনতাসির মোরশেদ। তিনি নর্থ সাউথের পাশাপাশি ড্যাফোডিলকেও সংযুক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন। যদিও তিনি কর্মরত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা ফেলো হিসেবে।
মুনতাসির মোরশেদ গত ৬ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতি ভালোবাসা’র কারণে তিনি তাদের নাম দিয়েছেন। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ড্যাফোডিলের ‘অতিথি গবেষক’। তিনি আরও বলেন, ‘ঠিক কী কারণে গবেষণাগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেটা আমি পরিষ্কার নই।’
মুনতাসির মোরশেদের প্রত্যাহার হওয়া আটটি গবেষণা পাঠানো হলে এই ঘটনাকে ‘গুরুতর অপরাধ’ উল্লেখ করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এনামুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পদক্ষেপ নেব।’
ছিল প্রণোদনা ও পুরস্কার
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন গবেষকের অন্তত ৪৪টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রত্যাহার হওয়া ব্যক্তিদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়টির ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মমিনুর রহমান। তাঁর সাতটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটিতে তিনি মূল লেখক এবং দুটি গবেষণায় সহলেখক ছিলেন।
গবেষণাগুলোর বিষয় ছিল ক্যানসার, ন্যানোমেডিসিন, আলঝেইমার রোগ, কোভিড-১৯ এবং সামুদ্রিক উপাদান থেকে ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা ইত্যাদি।
বিশ্বের অন্যতম বড় গবেষণা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্প্রিঞ্জার ও এলসেভিয়ার তাদের তদন্তে উল্লেখ করেছে, গবেষণাগুলোয় নানা অনিয়ম খুঁজে পাওয়ায় সম্পাদকীয় বোর্ড গবেষণাগুলোর বৈজ্ঞানিক ফলাফলের ওপর আস্থা হারিয়েছে।
মমিনুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ড্যাফোডিলের ফার্মেসি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তিনি বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি গবেষকদের বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকে। গবেষণার মানের ভিত্তিতে একজন গবেষক ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা পান। এ ছাড়া বিশেষ অবদানের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা এবং প্রতিবছর অনুষদ ও বিভাগভিত্তিক ‘বেস্ট রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
যাঁদের গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রদত্ত অর্থ ফেরত নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির গবেষণা বিভাগের পরিচালক মাহফুজা পারভীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের কিছু নজির এখানে রয়েছে। মমিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টির সুরাহা করা হবে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নাম ব্যবহার করে গবেষণা প্রকাশ করেছেন, এমন কয়েকজন গবেষক বাস্তবে অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাঁদের একজন তালহা বিন ইমরান। তাঁর ১০টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকী থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গবেষণাপত্রে ড্যাফোডিলের নাম ব্যবহার করা হলেও তিনি বর্তমানে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে কর্মরত।
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, এমন ৯টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে আব্দুল কাদের মহিউদ্দিন নামের এক গবেষকের। গবেষণাগুলোতে একমাত্র লেখক মহিউদ্দিন। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়নি। কোনো সহলেখকও নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মহিউদ্দিন নামের এই গবেষক ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির ফার্মেসি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ২০২২ সালের পর থেকে তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সতর্ক করেই দায় সারল বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনা সামনে এলে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আবু রেজা মো. তৌফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় গত বছর। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির সিন্ডিকেট সভা অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলামকে লঘুদণ্ড হিসেবে সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলাম সহলেখক হিসেবে আছেন, এমন নয়টি গবেষণা প্রত্যাহার হওয়ার তথ্য পেয়েছে প্রথম আলো। যেগুলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাহৃত হয়েছে। গবেষণাগুলো করোনাকালে ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) থেকে সৃষ্ট দূষণ, বঙ্গোপসাগর উপকূলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছিল।
কেন শুধু সতর্ক করেই দায় সেরেছে বিশ্ববিদ্যালয়—এমন প্রশ্নে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শওকত আলী গত ১৪ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জটিলতায় পড়েছিল। কারণ, গবেষণা প্রত্যাহারের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা তাঁদের সামনে ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব কোনো নীতিমালাও নেই।
নিজ গবেষণার তথ্য পুনর্ব্যবহার
চিনি, টি–ব্যাগ, সুন্দরবনের পশুর নদের মাছ এবং কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে একের পর এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত এসব গবেষণায় তিনি সহলেখক ছিলেন।
অবশ্য আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর তদন্তে উঠে এসেছে, তাঁর নাম থাকা কয়েকটি গবেষণায় বাস্তব পরীক্ষার পরিবর্তে কাল্পনিক উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ইতিমধ্যে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সহলেখক হিসেবে থাকা ১০টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুন্দরবনের প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে ২০২২ সালে তাঁর দলের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়, যা এখনো প্রত্যাহার হয়নি। তবে পরে ওই গবেষণার তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে নতুন পরীক্ষা ছাড়াই আরও গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান গত ৭ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সৎ থাকার চেষ্টা করেছিলেন। প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে মূল যোগাযোগ ছিল ব্রাজিলের গবেষক গুইলহার্ম মালাফাইয়ার। তাই কোথায় সমস্যা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সঠিকভাবে জানেন না। গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার পর আমি সতর্ক হয়েছি।’
পদোন্নতির আবেদনে প্রত্যাহৃত গবেষণা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক স্বপন চন্দ্র মজুমদার। তিনি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘সেরা গবেষক’ পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২২ সালে তিনি সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। তবে প্রথম আলোর হাতে আসা এই অধ্যাপকের পদোন্নতির আবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আবেদনের শুরুতে স্বপন চন্দ্র মজুমদার যে গবেষণার কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রত্যাহার করে নেয় প্রকাশনা সাময়িকী।
উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে পরিবেশদূষণ কমানোর বিষয়ে করা সেই গবেষণায় স্বপন চন্দ্র মজুমদার সহলেখক ছিলেন। এটি প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে প্রকাশনা সাময়িকী বলেছে, গবেষণা প্রকাশের আগে বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনাটি ছিল ভুয়া।
স্বপন চন্দ্র মজুমদারের আরেকটি গবেষণা প্রত্যাহার হয় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। সেই গবেষণায় মূল লেখক ছিলেন এই অধ্যাপক। করোনা মহামারির সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকারদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর করা এই গবেষণাটিও গবেষণা সাময়িকী প্রত্যাহার করছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এই গবেষণার লেখা, তথ্য, গবেষণার ফলাফল কিংবা ধারণা নেওয়ার ক্ষেত্রে চৌর্যবৃত্তি হয়েছিল।
অধ্যাপক স্বপন চন্দ্র এসব অভিযোগ অসত্য দাবি করে বলেন, প্রকাশনা সংস্থাগুলো নিজেদের কিছু অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে গবেষণাপত্র দুটি প্রত্যাহার করে। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামানের ১১টি গবেষণাপত্র কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী থেকে জালিয়াতির অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অধ্যাপক কামরুজ্জামানের প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাগুলো প্রকাশ হয়েছিল ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে। আর প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটে ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে।
প্রত্যাহার হওয়া ১১টি গবেষণার মূল বিষয়বস্তু ছিল সবুজ অর্থনীতি, টেকসই উন্নয়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা। গবেষণাগুলোর ৫টিতে মো. কামরুজ্জামান প্রধান লেখক ছিলেন। ৬টিতে তিনি ছিলেন সহলেখক। ৪টিতে সহলেখক ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের অধ্যাপক সালমা করিম।
বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিঞ্জার ও এলসেভিয়ারের সম্পাদকীয় বোর্ড গভীর তদন্তের পর এই গবেষণাপত্রগুলো বাতিল ঘোষণা করে। সংস্থাগুলো প্রত্যাহার নোটে যেসব জালিয়াতির কথা বলেছে, এর মধ্যে ছিল ভুয়া পিয়ার-রিভিউ।
কামরুজ্জামান গত ২০ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর পেছনে কোনো বড় ধরনের জালিয়াতি বা লেখা চুরির ঘটনা ছিল না। মূলত ‘লিটারেচার রিভিউ’ বা তথ্যসূত্রের কিছু অসামঞ্জস্যের কারণে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছিল।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মো. জুলফিকার রহমান বলেন, গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়টি তাঁরা জানতেন না। জেনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জবাবদিহির ব্যবস্থা কী
গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে গবেষকেরা সাধারণত দেশীয় বিভিন্ন জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করে নিজেদের পদোন্নতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্যান্য সুবিধা নেন। বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা কম। তাতেও অনিয়ম, চুরি ইত্যাদি ধরা পড়ছে। কিন্তু গবেষণা প্রত্যাহার হলে জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ নিজের কার্যালয়ে ১৬ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া প্রথমত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় যদি অভিযোগ উপেক্ষা করে বা ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন ইউজিসি নিজে তদন্ত করবে এবং সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।’ এখন দেখার বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও ইউজিসি কী পদক্ষেপ নেয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক : উজ্জ্বল হোসাইন ।  কপিরাইট © রূপসী বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন