ভোরের সূর্যটা তখনো মেঘনার ধূসর পানিতে পুরোপুরি আলোর রেখা আঁকতে পারেনি। কিন্তু চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর, আনন্দবাজার, হরিণা ফেরিঘাট আর লালপুর এলাকার মেঘনার তীরে অন্য দিনের চেয়ে দৃশ্যপট একদম ভিন্ন। অন্য যেকোনো দিনে এ সময় নদীর বুকে ইঞ্জিনের শব্দে শত শত নৌকা ট্রলার ভেসে বেড়ায়, দূর থেকে শোনা যায় জালের ঝপঝপ শব্দ কিংবা কাঙ্ক্ষিত রূপালী ইলিশ পাওয়ার পর জেলেদের আনন্দঘন শোরগোল। কিন্তু আজ সেই চেনা কোলাহল নেই। নদীর বুকে যাওয়ার বদলে একের পর এক নৌকা ভেড়ানো হচ্ছে পাড়ে। জালের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা জল শুকাতে সেগুলোকে শুকানোর বাঁশে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন মধ্যবয়সী জেলেরা। কেউ নৌকার তলায় আলকাতরা বা পিচ মাখাচ্ছেন, কেউ কাঠের জোড়াতালি ঠিক করছেন হাতুড়ি দিয়ে, আবার কেউ শত ছিদ্রযুক্ত পুরোনো জালটি গুটিয়ে অতি যতনে তুলছেন ঘরে।
মেঘনার তীরজুড়ে এখন এক অন্য রকম নীরব প্রস্তুতি। তবে এই প্রস্তুতি আনন্দ বা উদযাপনের নয় এটি অস্তিত্ব রক্ষায় একটি বাধ্যবাধকতামূলক বিরতির প্রস্তুতি। আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ দিন ধরে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। মৎস্য বিজ্ঞানের নিয়মানুসারে, আশ্বিনী পূর্ণিমার এই নির্দিষ্ট সময়ে মা ইলিশ সমুদ্রের লোনা পানি ছেড়ে নদীর স্বাদু পানিতে ডিম ছাড়তে আসে। এই ডিম ছাড়ার সময়টায় মা ইলিশকে সুরক্ষা দেওয়া ও নির্বিঘ্নে প্রজননের সুযোগ করে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য। চাঁদপুর সীমান্ত থেকে শুরু করে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনার বিশাল এলাকা এই নিষেধাজ্ঞা আওতাভুক্ত থাকবে।
মা ইলিশ রক্ষায় এই ২২ দিনের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা ইলিশের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে—এমন বৈজ্ঞানিক যুক্তির পাশাপাশি বাস্তবতার নির্মম উল্টো পিঠে রয়েছে লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকার সংকট। চাঁদপুর জেলার রেজিস্টার্ড বা নিবন্ধিত ৪১ হাজার জেলের ঘরে এখন শুধুই অমঙ্গল ও অনিশ্চয়তার ছায়া। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি নিবন্ধিত পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবি ও ক্ষোভ—শুধু চাল দিয়ে ২২ দিনের সংসার, সন্তানের লেখাপড়া, ওষুধপত্র এবং নৌকার ঋণ পরিশোধ চালানো অসম্ভব। নদীভিত্তিক চাঁদপুর জেলার এই বিরাট জনগোষ্ঠী তাই একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থে মা ইলিশ রক্ষায় নিজেদের নদী থেকে তুলে নিলেও, বেঁচে থাকার আকুতিতে তাদের বুকের ভেতর নিঃশব্দে বাজছে হাহাকার।
মা ইলিশ হলো প্রজননশীল মাছ। সাগর থেকে নদী—এই রূপালী প্রজাতিটির জীবনচক্র এক অপূর্ব প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলে। বছরের অন্য সময় সাগরে ঘুরে বেড়ালেও আশ্বিন ও কার্তিক মাসের পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে বিশাল আকৃতির মা ইলিশ কোটি কোটি ডিম বহন করে স্বাদু পানির সন্ধানে মেঘনা, পদ্মা ও প্রমত্তা নদীগুলোর মোহনায় ধেয়ে আসে।
ইলিশ বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক মা ইলিশ একবারে প্রায় ৩ লাখ থেকে ২৩ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। যদি এই নির্দিষ্ট সময়টাতে মা ইলিশ শিকার বন্ধ রাখা যায় তবে নদী ও সাগরে নতুন করে শত কোটি জাটকার জন্ম হবে যা পরবর্তী বছর দেশে ইলিশের উৎপাদন অভাবনীয় হারে বাড়িয়ে দেবে।
চাঁদপুর জেলার প্রবীণ জেলেদের ভাষায়, ইলিশ তো খালি মাছ না, ইলিশ হইলো নদী মায়ের বরকত। চাঁদপুরের মোহনায় যে মাছ পাওয়া যায়, তার স্বাদ ও গন্ধ বিশ্বজোড়া খ্যাতির মূল কারণ এই স্বাদু পানির পুষ্টি উপাদান।
মৎস্য বিভাগের গবেষকরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে ইলিশের বার্ষিক উৎপাদন পৌনে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই ২২ দিনের সময়সীমা হলো প্রাকৃতিক উপায়ে ইলিশের বংশবৃদ্ধির সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এ সময় ইলিশ পানিতে সাঁতার কাটার সময় যেকোনো ধরণের শব্দ বা জালে বাঁধা পেলে ডিম ছাড়তে বাধাগ্রস্ত হয় বা মারা যায়। ফলে প্রজনন নিশ্চিত করা মানে কেবল ইলিশ রক্ষা নয়, বরং দেশের সার্বিক মৎস্য অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
নদী গবেষকদের মতে, মেঘনার চাঁদপুর অংশের ৭০ কিলোমিটার এলাকা মা ইলিশের অন্যতম প্রিয় বিচরণ ও ডিম ছাড়ার স্থান। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া—এই তিন নদীর মিলনস্থল হিসেবে চাঁদপুরের পানি ও খাদ্যের বৈশিষ্ট্য মা ইলিশকে প্রজননের জন্য আকৃষ্ট করে। তাই সরকার ২০০৭-০৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এই মা ইলিশ রক্ষা অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিচালনা করে আসছে। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, এ সময় নদীতে যেকোনো ছোট-বড় জাল ফেলা, নৌকা নামানো, মাছ পরিবহন, বিপণন, মজুদ ও ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।
হানারচর ইউনিয়নের জেলেপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ঘরের আঙিনায় কিংবা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক ডজন জেলে। মো. বাচ্চু (৪৫) নামের এক জেলে নিজের জালের একটি জায়গায় ছেঁড়া অংশ সুতো দিয়ে বুনছিলেন। টানা প্রায় ২৫ বছর ধরে মেঘনায় মাছ ধরছেন তিনি। বাচ্চুর কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি বলেন, নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে আমাদের পেটও বন্ধ হইয়া যায়। সরকার আমাদের খাদ্য সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি চাল দেয়, কিন্তু চাল দিয়া কি আর সবকিছু চলে? কাঁচাবাজার করতে হয়, ছোট পোলাটার ওষুধ কিনতে হয়, বড় মেয়ের স্কুলের বেতন দেওয়া লাগে। নদীতে না নামলে একদিনও আমাদের নগদ কোনো আয় থাকে না। চাল দিয়া ভাত রাঁধা যায়, কিন্তু ভাতের লগে তরকারিটা রান্না করার পয়সাও তো এই ২২ দিন আমাদের কাছে থাকে না।
একই এলাকার অপর এক জেলে মো. আলমগীর (৩৮) নিজের কাষ্ঠনির্মিত ছোট্ট নৌকাটি পাড়ে তুলে রাখা তক্তা দিয়ে মেরামত করছিলেন। হাতুড়ির প্রতিটি পিটুনির সাথে তিনি প্রকাশ করছিলেন ভেতরের চাপা ক্ষোভ। আলমগীর বলেন, আইন আমরা মানি, মা ইলিশ না বাঁচলে তো আমরা পরবর্তীতে মাছ পামু না। কিন্তু আমাদের কথা কে ভাবে? নৌকা ও জাল সংস্কার করতেই তো ৩০-৪০ হাজার টাকা খরচ হইছে। মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিছি। এখন ২২ দিন নদীতে যামু না, অথচ মহাজন তো সুদের হিসাব বন্ধ রাখব না। সংসারের প্রতিদিনের খরচ, ডাল-তেল-নুন, সন্তানের পড়াশোনা, আর হুটহাট কেউ অসুস্থ হইলে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার টাকা কোথায় পামু? খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি যদি এই ২২ দিন অন্তত কয়েক হাজার টাকা নগদ আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হইতো, তাইলে আমাদের মতো নিঃস্ব জেলেদের পিঠ দেয়ালে ঠেকতো না।
চাঁদপুর সদরের হরিণা ফেরিঘাট এলাকার জেলেপাড়ার ছবিটাও একই রকম বিষণ্ন। এখানে শত শত ছোট-বড় ডিঙ্গি ও ট্রলার লাইন ধরে নোঙর করে রাখা হয়েছে। নদীর পাড়ে বসে থাকা কজন বৃদ্ধ জেলে আফসোস করে বলছিলেন, আগের দিনে নদী এত শাসন ছিল না, মাছও পাওয়া যেত প্রচুর। এখন নদীতে মাছের সংখ্যা যেমন কমছে, তেমনি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদও বেড়েছে। সরকার যে চাল দেয়, অনেক সময় নিবন্ধিত তালিকার জটিলতায় প্রকৃত জেলেরা সে চাল পায় না, আবার কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞার মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে চাল হাতে পান। ফলে এই ২২ দিনের অনাহার ও অর্ধাহারের ভয় জেলে পরিবারগুলোকে তাড়া করে বেড়ায়। মা ইলিশ প্রজনন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষেত্রে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। চাঁদপুর জেলায় নিবন্ধিত মোট জেলের সংখ্যা ৫২ হাজারের বেশি হলেও, মৎস্য বিভাগের বিশেষ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির (ভিজিএফ) আওতায় এবার ৪১ হাজার চিহ্নিত জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল প্রদান করা হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরো বলেন, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। এই ২২ দিন যদি আমরা শতভাগ সফলভাবে মেঘনা ও পদ্মাকে মাছ ধরা মুক্ত রাখতে পারি, তবে তার সুফল আমাদের দেশের পুরো অর্থনীতি পাবে। ইলিশের প্রাচুর্য বাড়লে শেষ পর্যন্ত জেলেদেরই লাভ হয়।
জেলেদের খাদ্য সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা জানি নিবন্ধিত জেলের সংখ্যার তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা সীমিত এবং শুধু খাদ্য দিয়ে একটি পুরো পরিবারের ২২ দিনের সমস্ত খরচ সামলানো কঠিন। তবুও সরকারের বিদ্যমান ভিজিএফ কর্মসূচির মাধ্যমে ৪১ হাজার পরিবারকে মোট ১ হাজার ২৫ মেট্রিক টন চাল বণ্টন করা হবে। যাতে অভিযানের শুরুতেই জেলেরা এই চাল হাতে পান, সে জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে দ্রত চাল বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলেদের উদ্বুদ্ধ করতে আমরা বিভিন্ন হাট-বাজার ও জেলেপাড়াগুলোতে মাইকিং, সচেতনতামূলক সভা এবং পোষ্টার লাগানোর কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।
তবে মৎস্য বিভাগের এই ব্যাখ্যার বিপরীতে জেলেদের পক্ষ থেকে বারবার একটি কার্যকর সমন্বিত নীতির কথা বলা হচ্ছে। জেলে সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ জানান, বাংলাদেশে অন্যান্য খাতের শ্রমিক বা পেশাজীবীদের জন্য আপৎকালীন ভাতা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকলেও, দেশের জাতীয় সম্পদ ‘ইলিশ’ রক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নেওয়া এই জেলেদের জন্য কেবল ২৫ কেজি চালই শেষ ভরসা। তারা মনে করেন, অন্তত প্রজনন মৌসুমে জেলেদের জন্য একটি ‘বিশেষ রিকভারি ফান্ড’ করা উচিত, যেখান থেকে চালের সাথে নগদ ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা প্রদান করা হবে। এটি করা গেলে জেলেরা অসাধু ব্যবসায়ী বা দাদনদারদের প্রলোভনে পড়ে গোপনে নদীতে নামার ঝুঁকি নেবে না।
৮ অক্টোবর প্রথম প্রহর থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে চাঁদপুরের মেঘনা ও পদ্মা নদীর ৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসানো হচ্ছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড এবং বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে বহুমাত্রিক টহল টিম।
চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে বলেন, নদীপথ মুক্ত রাখা এবং বেআইনিভাবে মাছ ধরা রোধে নৌ পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে। আমরা চাঁদপুরের মেঘনা নদীর প্রবেশমুখ, মোহনা এবং দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল চৌকি ও মোবাইল টিম মোতায়েন করছি। নদীতে কোনো অসাধু চক্র যাতে ইলিশ শিকার করতে না পারে, সে জন্য স্পিডবোট ও নৌ-পুলিশের একাধিক টিম ২৪ ঘণ্টা পাহাড়ায় থাকবে।
তিনি আরও সতর্ক করে দেন, আইন সবার জন্য সমান। যারা আইন অমান্য করে নদীতে নামবে, কারেন্ট জাল বা নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করবে কিংবা মা ইলিশ পরিবহন ও বিক্রি করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইনে মামলা দায়ের করা হবে। ইতিমধ্যে আমরা স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের তালিকা প্রস্তুত করেছি, যাতে কেউ জেলেদের প্ররোচিত করতে না পারে।
কোস্ট গার্ড স্টেশন কমান্ডারদের সূত্রে জানা গেছে, মেঘনার বিস্তীর্ণ এলাকা এবং মেঘনার শাখানদীগুলোতে রাত ও দিনের বেলায় বিশেষ মেটাল শার্ক ও দ্রুতগামী বোট নিয়ে পাহাড়া দেওয়া হবে। যেসব দুর্গম চরাঞ্চলে অসাধু জেলেরা গোপনে মা ইলিশ ধরে আত্মগোপন করে, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে চিরুনি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযান পরিচালনা করার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে গঠিত ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিক নদীতে অবস্থান করবেন। ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক জেল, জরিমানা এবং জাল জব্ধ করে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ রয়েছে।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান এই মেগা অভিযান সফল করতে জেলা টাস্কফোর্স কমিটির সাথে একাধিক সমন্বয় সভা করেছেন। তিনি জানান, জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশের অবদান অপরিসীম এবং মা ইলিশ রক্ষা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার।
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, মা ইলিশ রক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো আগামী দিনের জন্য দেশের প্রোটিন নিরাপত্তা ও ইলিশের বংশবৃদ্ধি সুসংহত করা। চাঁদপুর জেলা প্রশাসন এ বছর শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে। মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটার জলসীমায় মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নৌ বাহিনীর সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত নজরদারি চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জেলেদের দাবির বিষয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক বলেন, আমরা জানি নিবন্ধিত জেলে পরিবারগুলো নিষেধাজ্ঞার সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তবে রাষ্ট্র তাদের এই ত্যাগের মূল্য স্বীকার করে বলেই ভিজিএফ কর্মসূচির মাধ্যমে চাল বিতরণ করছে। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করব যেন প্রকৃত নিবন্ধিত জেলেরা সময়মতো কোনো প্রকার অনিয়ম ছাড়া তাদের বরাদ্দকৃত চাল পান। আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলে নেতাদের সাথেও কথা বলেছি, যাতে তারা জেলেদের সচেতন করেন এবং নদীতে যেতে নিরুৎসাহিত করেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন চাঁদপুরের সকল মৎস্য আড়ত, বরফ কল, মাছের বাজার এবং নদী সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা গোপনে অনলাইন ডেলিভারির মাধ্যমে কেউ ইলিশ বিক্রি করছে কি না, তাও মনিটর করার জন্য আইটি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।
মা ইলিশ রক্ষার এই ২২ দিন চাঁদপুর জেলার উপকূলীয় অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়। মেঘনা পাড়ের অর্থনীতি কেবল মাছ ধরার ওপর নির্ভর করে না বরং মাছকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে ট্রলারের জ্বালানি ব্যবসা, বরফ কারখানা, জাল বুনে জীবিকা নির্বাহকারী নারী ও শিশু, ঝুড়ি প্রস্তুতকারক এবং স্থানীয় খাবার দোকান। নদীর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে এই পুরো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলে মন্দা দেখা দেয়।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় এনজিও এবং স্থানীয় দাদনদারদের ঋণের কিস্তি নিয়ে। বহু জেলে নৌকা কেনা, ইঞ্জিন মেরামত বা জাল কেনার জন্য এনজিও এবং চড়া সুদের দাদনদারদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। নদী বন্ধ থাকলেও এনজিওর সাপ্তাহিক কিস্তি আদায় বন্ধ থাকে না।
হানারচরের এক নারী রহিমা বেগম বিষণ্ন কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী জেলে। নদীতে না গেলে আমাদের ঘরে চাল থাকলেও তরকারি জোটে না। তার ওপর আগামী সপ্তাহে এনজিওর ২৫০০ টাকা কিস্তি দেওয়া লাগবে। কিস্তির লোক তো আর বুঝবে না যে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ। চাল বেচে তো আর কিস্তি দেওয়া যায় না! সরকার যদি এই ২২ দিন এনজিওর কিস্তি আদায় স্থগিত রাখার নির্দেশ দিত, তবে আমাদের মতো গরিব মানুষদের দম ফেলার একটু সুযোগ হইত।
জেলে সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, প্রতি বছর প্রজনন মৌসুম এলেই জেলেদের এই দুর্দশা দৃশ্যমান হয়, কিন্তু এর কোনো দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধান আজও হয়নি। তারা দাবি জানান : নিবন্ধিত জেলেদের চালের পাশাপাশি ন্যূনতম ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা; নিষেধাজ্ঞার পুরো ২২ দিন ব্যাংক ও এনজিও ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি আদায় সরকারি অধ্যাদেশ জারি করে সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা; প্রকৃত জেলেরা যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়ে এবং কোনো অ-জেলে যেন জেলে কার্ড ব্যবহার করে সুবিধা নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক জেলে কার্ডের মাধ্যমে চাল বিতরণ করা; জেলে পরিবারের নারীদের এই ২২ দিনে বিকল্প কর্মসংস্থান যেমন—হস্তশিল্প, সেলাই বা গবাদিপশু পালনের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া।
সব অভাব, অভিযোগ ও সংকটের পরও চাঁদপুরের মেঘনা পাড়ের অধিকাংশ জেলে মা ইলিশ রক্ষার এই মহা উদ্যোগকে হৃদয়ে ধারণ করেন। কারণ তারা জানেন, আজ যদি তারা মা ইলিশকে সুরক্ষা দেন, কাল সেই নদীর বুক থেকেই তারা হাসিমুখে জাল ভর্তি রূপালী ইলিশ তুলে আনতে পারবেন। ইলিশ কেবল একটি মাছ নয়; এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য এবং আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মেঘনার তীরের বিকেল গড়াতেই আকাশে লালাভ আভা ছড়িয়ে পড়ে। তীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত নৌকা আর গুটানো জালের সারি যেন এক নীরব ত্যাগের গল্প বলে যায়। জাতীয় স্বার্থে নিজের জীবিকা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার যে বিরল দৃষ্টান্ত চাঁদপুরের এই ৪১ হাজার জেলে পরিবার প্রতি বছর স্থাপন করে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
এখন প্রয়োজন কেবল প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি জেলেদের মানবিক সংকটগুলোর প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের নজর দেওয়া। চালের সাথে সাথে নগদ অর্থ সহায়তা, এনজিওর কিস্তি স্থগিতকরণ এবং স্বচ্ছ খাদ্য বণ্টন নিশ্চিত করতে পারলে একদিকে যেমন মা ইলিশ রক্ষা অভিযান শতভাগ সফল হবে, অন্যদিকে মেঘনা পাড়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর চোখেমুখে জমে থাকা অমাবস্যার অন্ধকার কেটে ফুটবে এক নতুন আশার আলো। ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবরের এই ২২ দিনের মহাযজ্ঞের সফলতা কেবল মেঘনার বুকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:৪৪ অপরাহ্ণ