চাঁদপুর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ততম বাণিজ্যিক ও ট্রাফিক পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত ‘ওয়ারলেস বাজার’। চাঁদপুর পৌরসভার ১৩নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এই এলাকাটি মূলত জেলা শহরের প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন এই স্থান দিয়ে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। গড়ে উঠেছে বিশাল কাঁচাবাজার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু আধুনিক নাগরিক সুবিধার এই যুগেও অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এখানে নেই কোনো পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা। ফলে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী, ব্যবসায়ী, পথচারী এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুরা অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হচ্ছেন।
চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের ঠিক পাশেই অবস্থিত ওয়ারলেস বাজার। এই মোড়টি চাঁদপুর শহরের সাথে কুমিল্লা, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে প্রতিদিন শত শত যাত্রীবাহী বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং পণ্যবাহী ট্রাক থামে। ওয়ারলেস বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কাঁচাবাজারে ভোর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতার ঢল নামে। এ ছাড়াও আশপাশে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এত বিশাল কর্মযজ্ঞের এই কেন্দ্রে একটি পাবলিক টয়লেট না থাকাটা বর্তমান সময়ের এক বড় নাগরিক পরিহাস হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
সরেজমিনে ওয়ারলেস বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দূরপাল্লার বাস থেকে নামা যাত্রীরা টয়লেটের প্রয়োজনে দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটছেন। বিশেষ করে যারা লক্ষ্মীপুর বা নোয়াখালী থেকে চাঁদপুর হয়ে ঢাকা বা অন্য কোথাও যাতায়াত করেন, তাদের জন্য এই স্থানটি একটি বিরতিস্থল। কিন্তু এখানে নেমে টয়লেটের সুবিধা না পেয়ে তারা চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন।
ঢাকা অভিমুখী বাস যাত্রী আলামিন মুন্সি ক্ষোভের সাথে বলেন, দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় থাকার পর স্বাভাবিকভাবেই টয়লেটের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই ব্যস্ত বাজারে এসে যখন দেখি কোনো ব্যবস্থা নেই, তখন খুব অসহায় লাগে। বাধ্য হয়ে পাশের মসজিদ বা মাদ্রাসায় যেতে হয়। অনেক সময় তারা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ঢুকতে দিতে চায় না। এটি খুব অপমানজনক ও বিব্রতকর। পাবলিক টয়লেট না থাকার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী যাত্রীরা। পুরুষরা কোনোভাবে বিকল্প পথ খুঁজলেও নারীদের পক্ষে তা অসম্ভব। সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী রেবেকা সুলতানা বলেন, “জরুরি প্রয়োজনে নারীদের যে কী পরিমাণ কষ্ট হয়, তা কর্তৃপক্ষ বুঝলে হয়তো অনেক আগেই ব্যবস্থা নিত। আমাদের কোনো মানুষের বাসা খুঁজে বের করতে হয় কিংবা কোনো দোকানের পেছনে গিয়ে সাহায্য চাইতে হয়। একটি সভ্য সমাজে নাগরিক সুবিধা বলতে কিছুই নেই এখানে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওয়ারলেস বাজার সংলগ্ন এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)-এর পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা পড়ে আছে। অথচ জায়গা থাকা সত্ত্বেও সেখানে একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি চাঁদপুর পৌরসভা বা সওজ কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় ব্যবসায়ী সাগর গাজী জানান, আমরা বছরের পর বছর ধরে এখানে একটি টয়লেটের দাবি জানিয়ে আসছি। পৌরসভা বলে জায়গা নেই, আবার সওজ বলে তারা পরিকল্পনা করছে না। মাঝখান থেকে আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা এবং বাজারে আসা হাজার হাজার ক্রেতা কষ্ট পাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল বলেন, পৌরসভা চাইলে সওজ-এর সাথে সমন্বয় করে খুব সহজেই একটি আধুনিক পাবলিক টয়লেট তৈরি করতে পারত। এর জন্য বড় কোনো বাজেটের চেয়ে মানসিক সদিচ্ছার বেশি প্রয়োজন।
বাজারে পাবলিক টয়লেট না থাকায় এলাকার মসজিদগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। মুসুল্লিদের ইবাদতের জন্য সংরক্ষিত অজু ও টয়লেটের জায়গাগুলোতে সাধারণ মানুষের ভিড় লেগে থাকে। এতে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা যেমন কঠিন হচ্ছে, তেমনি মুসুল্লিদের ওজু করার ক্ষেত্রেও বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। অনেক সময় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে যখন মসজিদ কমিটি বহিরাগতদের প্রবেশে বাধা দেয়। ওয়ারলেস বাজারের সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, চাঁদপুর পৌরসভা শহরের অন্যান্য এলাকায় যেভাবে টয়লেট পরিচালনা করছে, এখানেও একই মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, “পৌরসভা এখানে একটি আধুনিক কমপ্লেক্স তৈরি করতে পারে যেখানে স্বল্প খরচে ব্যবহারের বিনিময়ে টয়লেট পরিচালনা করা হবে। সেখানে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে এবং সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য স্টাফ নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এতে পৌরসভার যেমন আয় হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও এক নিমেষে দূর হবে।”
যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগের ফলে এলাকার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। বাজারের পেছনের গলি বা ড্রেনের পাশে অনেকেই অস্বাস্থ্যকরভাবে প্রাকৃতিক কাজ সারছেন, যার ফলে মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ছে এবং দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
চাঁদপুর জেলা প্রশাসক, চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এলাকাবাসী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের দাবি, আর কত বছর অপেক্ষা করলে এই নূন্যতম নাগরিক সুবিধাটি নিশ্চিত হবে?
চাঁদপুর একটি পর্যটন ও ব্যবসা-সফল জেলা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ইলিশের বাড়ি হিসেবে খ্যাত এই শহরের প্রবেশদ্বারে এমন একটি জনদুর্ভোগ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ওয়ারলেস বাজারের এই সমস্যাটি এখন কেবল একটি দাবি নয়, বরং এটি হাজারো মানুষের অধিকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে চাঁদপুরকে একটি স্মার্ট ও নাগরিকবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলবে—এটাই এখন সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা।

মুহাম্মদ বাদশা ভূঁইয়া
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ । ১২:১৭ অপরাহ্ণ