টার্নওভার ট্যাক্স বৃদ্ধি : রাজস্বের চাপ নাকি বিনিয়োগের ঝুঁকি?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ । ১:৫৬ অপরাহ্ণ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী বাজেটে টার্নওভার ট্যাক্স (ন্যূনতম কর) এক শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করতে যাচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে আইএমএফের চাপ এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের তাগিদে সরকার এই পথে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে-টার্নওভার ট্যাক্স বাড়ানো কি সত্যিই একটি কার্যকর সমাধান,নাকি এটি বিনিয়োগ ও ব্যবসার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে? প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। টার্নওভার ট্যাক্স লাভের ওপর নয়, বরং মোট বিক্রয়ের ওপর আরোপিত হয়। ফলে একটি ব্যবসা লাভে থাকুক বা লোকসানে-এই কর তাকে পরিশোধ করতেই হয়। বাস্তবে এটি বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা তৈরি করে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ এসএমই খাতে নিট মুনাফা সাধারণত ৫-৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেখানে ২.৫ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স কার্যকর হলে, তা অনেক ক্ষেত্রে মুনাফার বড়ো অংশ শোষণ করে নিতে পারে। এতে করে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যবসা শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর সাধারণত স্থিতিশীল লাভে পৌঁছাতে সময় লাগে। সেই সময়েও যদি বিক্রয়ের ওপর কর পরিশোধ করতে হয়, তাহলে তা নগদ প্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে। এছাড়া এই কর বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত করের বোঝা পণ্যের দামে সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন। বিশেষ করে যে-সব খাতে মুনাফার মার্জিন কম, যেমন পাইকারি ও ডিস্ট্রিবিউশন খাতেও এর প্রভাব দ্রুত দেখা দিতে পারে।
করনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাস্তবতা ও গ্রহণযোগ্যতা। করহার যদি ব্যবসার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়,তাহলে কর ফাঁকি বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রসারের ঝুঁকি বাড়ে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যই ব্যাহত হতে পারে। এখানে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। সরকার রাজস্ব বাড়াতে চায়। এটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ ও বিনিয়োগ প্রবাহ ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক সমন্বয়ই একটি টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করে। নীতিগতভাবে,করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বৃদ্ধি,ডিজিটালাইজেশন এবং কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সহজীকরণ-এই দিকগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে করে রাজস্বও বাড়বে,আবার ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপও তৈরি হবে না। টার্নওভার ট্যাক্স বৃদ্ধি একটি সহজ নীতিগত পদক্ষেপ মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব বহুমাত্রিক। তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের বাস্তবতা,বিনিয়োগের পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব-সবকিছু বিবেচনায় নেওয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক : উজ্জ্বল হোসাইন ।  কপিরাইট © রূপসী বাংলা সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন