
বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড,দূতাবাসকে না জানানোর অভিযোগ,প্রবাসী নারী কর্মীদের নির্যাতন এবং সরকারের নীরবতা-সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে,সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা কার্যকর? একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করার সক্ষমতা। দেশের সীমানার ভেতরে হোক কিংবা হাজার মাইল দূরে,নাগরিক বিপদে পড়লে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে-এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে,সেগুলো বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অভিযোগ উঠেছে,দুই প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ সরকারও সংবাদমাধ্যমের খবরের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী,এ বিষয়ে সৌদি সরকারকে চিঠি দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। যদি এসব তথ্য সঠিক হয়ে থাকে,তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে-একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশের মাটিতে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হলে তাঁর দেশের দূতাবাস কী ভূমিকা পালন করেছে? বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে দূতাবাস অবগত ছিল কি না? অভিযুক্তরা আইনজীবীর সহায়তা,আত্মপক্ষ সমর্থন ও আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না? তাঁদের পরিবারকে জানানো হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা জরুরি।
দূতাবাস কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য?
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো প্রবাসী নাগরিকদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় কাজ করা। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত পরিণতি জড়িত থাকলে কনস্যুলার সহায়তা,আইনি প্রক্রিয়ার পর্যবেক্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নাগরিক অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তাঁর অধিকার শেষ হয়ে যায় না। অপরাধের অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া,আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইন অনুযায়ী আপিলের অধিকার। এখানে মূল প্রশ্ন কাউকে অপরাধমুক্ত ঘোষণা করা নয়। প্রশ্ন হলো,বিচারপ্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করেছিল কি না। বাংলাদেশ দূতাবাস যদি সত্যিই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কিছুই জানতে না পারে,তাহলে সেটি কেবল যোগাযোগের ব্যর্থতা নয়;প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন। কূটনীতি মানে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ,যৌথ বিবৃতি কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রশংসা নয়। কূটনীতি হলো প্রয়োজনে কঠিন প্রশ্ন তোলা,নাগরিকের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। বাংলাদেশ কি সৌদি আরবের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইবে? প্রয়োজনে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারের কাছ থেকেই আসা উচিত।
প্রবাসী নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগের জবাব কে দেবে?
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নির্যাতন,যৌন সহিংসতা,ধর্ষণ,জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করা এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগ বহুবার আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। যে নারী পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় বিদেশে কাজ করতে যান,তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়;বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে।
যদি কোনো নারী কর্মী নির্যাতনের শিকার হন,তাহলে তিনি কোথায় অভিযোগ জানাবেন? দূতাবাস কীভাবে তাঁকে আশ্রয়,আইনি সহায়তা ও দেশে ফেরার ব্যবস্থা দেবে? অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করবে? আর কোনো বাংলাদেশি নারী অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলে, তাঁর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচারের জন্য সরকার কী পদক্ষেপ নেবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পরিসংখ্যানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কতজন নারী দেশে ফিরেছেন,কতজন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন,কতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং কতটি মামলায় বিচার হয়েছে-এসব তথ্য যাচাইযোগ্যভাবে প্রকাশ করা দরকার।
শরিয়া আইনের প্রয়োগ কি সবার জন্য সমান?
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের সমতা। কোনো বাংলাদেশি কর্মী অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাঁর বিচার হবে,আইন অনুযায়ী শাস্তিও হতে পারে। কিন্তু একইভাবে কোনো সৌদি নাগরিকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি নারীকে নির্যাতন বা ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হতে হবে। ন্যায়বিচার কোনো দেশের নাগরিকত্ব,অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আইন ও নৈতিকতার কথা বলা হয় যখন,তখন দুর্বল মানুষের সুরক্ষা এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তির জবাবদিহিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তাই বাংলাদেশের দাবি হওয়া উচিত-প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত,ভুক্তভোগীর আইনি সহায়তা এবং প্রমাণিত অপরাধের যথাযথ বিচার।
বাংলাদেশের মানুষ শুধু হজ করতে যায় না, শ্রমও দেয়
প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি হজ পালনের জন্য সৌদি আরব যান। তাঁদের ব্যয় থেকে সৌদি আরবের ধর্মীয় পর্যটন ও সেবাসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিও উপকৃত হয়। একই সঙ্গে লাখ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে শ্রম দিয়ে নিজেদের পরিবার চালান এবং দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে অবদান রাখেন।
এই শ্রমিকেরা কারও দয়ার ওপর বেঁচে থাকেন না। তাঁরা কাজ করেন,পরিশ্রম করেন,ঘাম ঝরান এবং বৈধ উপার্জনের মাধ্যমে নিজেদের পরিবারকে সহায়তা করেন। তাঁদের শ্রমের মর্যাদা আছে। তাঁদের জীবনও মূল্যবান। তাঁরা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী হতে পারেন, কিন্তু তার চেয়েও আগে তাঁরা মানুষ-অধিকারসম্পন্ন মানুষ।
তাই বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় আবেগ বা শ্রমবাজারের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। এই সম্পর্কের মধ্যে থাকতে হবে পারস্পরিক সম্মান,নাগরিকের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সরকার কি জবাবদিহি চাইতে পারবে?
সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ধর্মীয়,অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারের সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে গভীর। কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার অর্থ এই নয় যে নাগরিকের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
বরং প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান। বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই জানতে চাইতে পারে-মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় কী বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে কেন অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের কাছে আরও কিছু দাবি থাকা উচিত:
আলোচিত মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করা। সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের বিচার, আপিল ও কনস্যুলার সহায়তার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া।
সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ কর্মীদের জন্য কার্যকর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাগুলোর তথ্য যাচাই,তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া। প্রবাসীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা,জরুরি সহায়তা এবং দূতাবাসের জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র,তার নাগরিকের মর্যাদাও স্বাধীন
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত বাস্তববাদী,মর্যাদাপূর্ণ ও নাগরিককেন্দ্রিক। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ,তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কোনো বাংলাদেশি অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার হবে। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায়। কোনো বাংলাদেশি নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর অভিযোগও গুরুত্ব পেতে হবে। আর কোনো নাগরিকের জীবন যখন মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে থাকে,তখন তাঁর রাষ্ট্রের ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া উচিত।
প্রশ্নটি তাই সৌদি আরব বাংলাদেশের চেয়ে বড় কি না,তা নয়। প্রশ্ন হলো,বাংলাদেশ তার নাগরিকের পাশে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে কাজ করে,দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায়,পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। তাঁদের জীবন,নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় হতে পারে না। বাংলাদেশের সরকারকে এখন স্পষ্ট করে বলতে হবে-প্রবাসী নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তারা কী করেছে,কী করতে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেবে।
কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি,সামরিক সক্ষমতা কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায়,বিদেশের মাটিতে বিপদে পড়া তার একজন সাধারণ নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা দিয়ে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : উজ্ব্বল হোসাইন
ভিজিট : www.dailyruposhibangla.com