খুঁজুন
                               
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৪ বৈশাখ, ১৪৩৩

সাংবাদিকতায় মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ১:২০ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকতায় মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া

অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং পেশার প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলে কোনো বাধাই শেষ পর্যন্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না—এ কথারই বাস্তব প্রতিফলন ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সাম্প্রতিক সাফল্য। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) পরিচালিত গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন। তার এই অর্জনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবসহ সাংবাদিক সমাজে আনন্দের বন্যা বইছে।
মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার এই অর্জন কেবল একটি একাডেমিক ফলাফল নয়; এটি এক দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত থাকা এবং নির্ধারিত সময়ে সবকিছু সম্পন্ন করা—এসবই তার জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত। মাঠপর্যায়ে কাজের চাপ, সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময়ই ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষাজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেই তিনি নিজের লক্ষ্য অর্জন করেছেন।
নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই বয়সে এসে সহপাঠীদের সঙ্গে বসে পড়াশোনা করা সহজ ছিল না। সুদূর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় এসে ক্লাস করা আমাদের জন্য সত্যিই কষ্টকর ছিল। প্রতিটি ক্লাসের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো, অনেক সময় ক্লান্তি ভর করতো। তবুও শেখার আগ্রহই আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়েছে।
তার এই বক্তব্যে উঠে আসে একজন সংগ্রামী শিক্ষার্থীর বাস্তব চিত্র। ভোরে রওনা দিয়ে রাজধানীতে ক্লাস করা, আবার রাতে ফিরে যাওয়া—এই চক্রের মধ্যেই কেটেছে তার শিক্ষাজীবনের বড় একটি অংশ।
গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। এখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসে। তাই নিজেকে দক্ষ ও আপডেট রাখতে পড়াশোনার বিকল্প নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিআইবির এই কোর্সটি তাকে সাংবাদিকতার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। সংবাদ লেখার কৌশল, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের নৈতিকতা, ডিজিটাল সাংবাদিকতা—এসব বিষয়ে তিনি নতুন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
এই সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের অবদান গভীরভাবে স্মরণ করেছেন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক পঙ্কজ কর্মকার, মুনিরা শারমিন, শুভ কর্মকার, লাজিনা জাসলিনসহ প্রেস ইনস্টিটিউটের সকল শিক্ষককে। তাদের দিকনির্দেশনা, আন্তরিকতা এবং সহযোগিতা আমাকে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন শিক্ষকদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা তাকে প্রতিটি ধাপে সাহস জুগিয়েছে। কঠিন বিষয়গুলো সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের আন্তরিক আচরণ তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
শিক্ষাজীবনের এই পথচলায় সহপাঠীদের ভূমিকাও কম নয়। নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে একটি চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করেছি, একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। বিশেষভাবে প্রিয় সহপাঠী উজ্জ্বল হোসাইন ও মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের কথা উল্লেখ করতে চাই, যারা সবসময় পাশে ছিল। তিনি জানান, ক্লাসরুমের আলোচনা, গ্রুপ স্টাডি, পরীক্ষা প্রস্তুতি—সবকিছু মিলিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যা তাদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার এই সাফল্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। সহকর্মী সাংবাদিকরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং তার এই অর্জনকে পুরো জেলার জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রেসক্লাবের একাধিক সদস্য বলেন, নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া সবসময় নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে আসছেন। তার এই একাডেমিক সাফল্য প্রমাণ করে, তিনি নিজেকে আরও উন্নত করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন।
এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পড়াশোনা, ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে পরিবারের সহযোগিতা তাকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছে। তিনি বলেন, আমার পরিবারের সদস্যরা সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছে। তাদের সমর্থন না থাকলে এই পথচলা এত সহজ হতো না। এই অর্জন তার পেশাগত জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, এই কোর্স আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। এখন আমি আরও দায়িত্বশীলভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করতে পারবো। তিনি ভবিষ্যতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন তৈরিতে আরও মনোযোগী হতে চান। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তরুণ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শেখার কোনো শেষ নেই। পেশার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। নিজের দক্ষতা বাড়াতে হবে, সত্যের প্রতি অটল থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বপূর্ণ পেশা, যেখানে সততা, নৈতিকতা এবং সাহসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার এই অর্জন নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কর্মজীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং দূরপাল্লার যাত্রার ক্লান্তি—সবকিছু অতিক্রম করে তিনি যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা প্রমাণ করে—ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
তার এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি গর্বের বিষয়। বিশেষ করে যারা কর্মজীবনের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার এই গল্প একটি শক্ত প্রেরণা হয়ে থাকবে। স্বপ্ন দেখুন, পরিশ্রম করুন—সাফল্য আসবেই—এই বিশ্বাসকেই নতুন করে দৃঢ় করেছে তার এই অর্জন।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।