খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

মাইলস্টোন ট্রাজেডি : মানুষরূপী পশুদের কারণে কষ্ট বেড়েছে দগ্ধদের

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ জুলাই, ২০২৫, ২:১৫ অপরাহ্ণ
মাইলস্টোন ট্রাজেডি : মানুষরূপী পশুদের কারণে কষ্ট বেড়েছে দগ্ধদের

রাজধানীর উত্তরা-১১ নম্বর সেক্টরের মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গুরুতর আহত শিক্ষার্থী ও কর্মীদের দুর্ঘটনার পর ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে দেখা দেয় যানজট, পানির সংকট, যোগাযোগ ও সহযোগিতার মারাত্মক ঘাটতি। একইসঙ্গে দুর্ঘটনায় আহত কারোর আইডি কার্ডে ছিল না জরুরি যোগাযোগের নম্বর কিংবা রক্তের গ্রুপ। ফলে শুরুতেই সংকটে পড়ে যান উদ্ধারকারীরা। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা ঘুরে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন অবস্থার কথা জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, দুপুর সোয়া ১টার পর বিমান বিধ্বস্তের শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই ছুটে আসেন শিক্ষার্থী, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া। শোনা যায় কান্না আর চিৎকারের শব্দ। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার জায়গার বেশির ভাগ অংশে ছিল মাইলস্টোন কলেজের প্রাইমারি সেকশন। সে সময় চলছিল প্রথম থেকে সপ্তম শ্রেণির ক্লাস। ঘটনার পরপর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিভাবকরাও ছুটে আসেন সন্তানদের খোঁজে।
প্রত্যক্ষদর্শী কলেজছাত্রী তাসফিয়া রহমান বলেন, আমি ক্লাসে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার। কেউ চিৎকার করছে, কেউ মোবাইলে কাউকে খুঁজছে। আহত কয়েকজনকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখি। তাদের পরিচয় জানার চেষ্টা করেও তেমন কিছু জানতে পারিনি। কারণ কারো আইডি কার্ডে ফোন নম্বর ছিল না, অভিভাবকের তথ্য ছিল না।
আবার ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যে চারপাশে জনতার ভিড় জমে যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করে ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে না পারায় আশঙ্কাজনক কয়েকজনের অবস্থার আরও অবনতি হয়। ঢামেকসহ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিকভাবে অন্তত ৩৫ জনকে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নেওয়া হয়।
মাইলস্টোনের কলেজ শাখার শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, আগুনে দগ্ধ শিক্ষার্থীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে দেখা দেয় চরম বিশৃঙ্খলা। স্বজন, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের ভিড়ে ব্যাহত হয় আহতদের দ্রুত স্থানান্তর, চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা অন্য শিক্ষার্থীরা জানান, বিমান বিধ্বস্তের স্থানটি ঘিরে মুহূর্তেই বিপুল জনসমাগম হয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও উৎসুক জনতার ভিড়ে রাস্তায় জট তৈরি হয়। যে অ্যাম্বুলেন্সগুলো দ্রুত রোগী বহন করতে এসেছিল, সেগুলোর গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চেষ্টা করছিল আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে কিন্তু রাস্তায় নেমে আসা মানুষের ভিড়ে সেই যাত্রা হয়ে পড়ে দুর্বিষহ।
আলভী নামের এক শিক্ষার্থী জানান, আমরা দগ্ধ কয়েকজনকে উঠিয়ে রিকশা-অ্যাম্বুলেন্সে তুলেছিলাম। কিন্তু সামান্য দূরত্ব পাড়ি দিতেই সময় লেগেছে প্রায় আধা ঘণ্টা। পথেই কয়েকজনের শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। আবার অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর কলেজ ক্যান্টিন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে তখন বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দেয়।
মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলেন, চারদিকে ধোঁয়া, গায়ে পোড়া গন্ধ এমন পরিস্থিতিতে এক বোতল পানির জন্য ঘুরতে হয়েছে পাঁচ জায়গায়। ক্যান্টিন বন্ধ থাকায় খাবার পানি মেলেনি।
অন্যদিকে, দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে রিকশা, অটো ও সিএনজি চালকরা কয়েকগুণ ভাড়া হাঁকিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন অভিভাবক বলেন, সিএনজি চালক ৭০ টাকার ভাড়ার জায়গায় ২০০ টাকা চাইলেন। বাধ্য হয়েই দিতে হয়েছে, কারণ সন্তান তখন হাসপাতালের পথে।
এমন পরিস্থিতিতে ছয় দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের ছয়টি দাবি হলো–
১. দুর্ঘটনায় নিহতদের সঠিক নাম ও পরিচয় প্রকাশ করতে হবে।
২. আহতদের নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
৩. ঘটনাস্থলে শিক্ষকদের গায়ে সেনাসদস্যদের ‘হাত তোলার’ অভিযোগে নিঃশর্ত প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
৪. নিহত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবারকে বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৫. বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বিমান বাতিল করে নতুন ও নিরাপদ প্লেন চালু করতে হবে।
৬. বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ এলাকা মানবিক ও নিরাপদভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
মাইলস্টোন আজ রাজ্যের নীরবতা, ফাঁকা ক্লাসরুমে শোকের ছায়া
বিমান বিধ্বস্ত ও আগুনে ঝলসে যাওয়ার পর আজ মাইলস্টোন কলেজ অচেনা এক রূপে। যেখানে প্রতিদিন সকাল থেকেই মুখর হয়ে উঠত ক্লাসরুম, করিডর আর ক্যান্টিন, সেখানে আজ রাজ্যের নীরবতা। নেই কোনো হৈচৈ, নেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা। দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি ২৪ জুলাই পর্যন্ত সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। তবে কলেজে উপস্থিত অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা বলছেন, এই শিক্ষাঙ্গনে যেন এখন শুধুই শোক, ভয়ার্ত চোখ আর দগ্ধ স্মৃতির ভার। সূত্র : ঢাকা পোস্ট।

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।