খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১ মাঘ, ১৪৩২

বসন্ত : সৌন্দর্য, আনন্দ ও নবজাগরণের ঋতু

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ৫:৩০ অপরাহ্ণ
বসন্ত : সৌন্দর্য, আনন্দ ও নবজাগরণের ঋতু

প্রকৃতির চির পরিবর্তনশীল রূপের মধ্যে ঋতু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বসন্ত হলো সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর ও প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ ঋতু। শীতের শুষ্কতা ও নিস্তব্ধতার পর বসন্ত আসে নতুন প্রাণের সঞ্চার নিয়ে। চারপাশ ভরে ওঠে ফুলের সৌরভ, কোকিলের সুমধুর ডাক আর প্রাণবন্ত বাতাসে। এ ঋতু শুধু প্রকৃতির পরিবর্তনই নয়, বরং মানুষের মনেও এক নতুন উদ্দীপনা, উচ্ছ্বাস ও সৃজনশীলতার সঞ্চার করে। তাই বসন্তকে বলা হয় সৌন্দর্য, আনন্দ ও নবজাগরণের ঋতু।
বসন্ত ঋতু প্রকৃতির এক অনন্য উপহার, যা শীতের নিষ্প্রাণ পরিবেশের পর এক নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে আসে। ফাল্গুন আর চৈত্র, এই দুই মাসজুড়ে বাংলার প্রকৃতি এক অপরূপ সাজে সেজে ওঠে। গাছের নতুন সবুজ পাতা, বাহারি ফুলের মেলা, পাখির গান, বাতাসের মৃদু স্পর্শ— সব মিলিয়ে বসন্ত এক আনন্দঘন আবহ তৈরি করে।

শীতের কারণে যে গাছগুলো পত্রশূন্য হয়ে পড়ে, বসন্তের আগমনে সেগুলোতে নতুন প্রাণ ফিরে আসে। চারদিকে ফুটতে শুরু করে কচি সবুজ পাতা। কৃষ্ণচূড়া, শিমুল, পলাশ, গুলমোহর ফুলে ফুলে লাল-হলুদ-কমলা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি। আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন ফলগাছে মুকুল ধরতে শুরু করে, যা বসন্তের অন্যতম সৌন্দর্য। বসন্তকে ফুলের ঋতু বলা হয়। এ সময় বিভিন্ন ধরনের ফুল ফুটে ওঠে, যা প্রকৃতিকে করে তোলে মনোমুগ্ধকর। লাল-কমলা রঙের আগুনের মতো পলাশ ফুল বসন্তের অন্যতম আকর্ষণ। বড় লাল ফুল বিশিষ্ট শিমুল গাছ বসন্তের রূপ বৈচিত্র্যে অনন্য। কৃষ্ণচুড়া গাছে আগুনের মতো উজ্জ্বল লাল ফুল ফোটে, যা পথ-প্রান্তরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে।ররজনীগন্ধা ও বেলি ফুলের মৃদু সুগন্ধ বসন্তের রাতকে আরও মোহনীয় করে তোলে। শীতের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে বসন্তে পাখিরা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। কোকিলের ডাকে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। কোকিলের ডাক বসন্তের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া দোয়েল, শ্যামা, টিয়া, ময়না, শালিক, ফিঙে, বাবুইসহ নানা পাখির কলতানে প্রকৃতি হয়ে ওঠে সুরেলা। বসন্তের বাতাস থাকে হালকা ও মৃদু শীতল। এটি শরীরে এক অনন্য প্রশান্তি এনে দেয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের আগে বসন্তের আবহাওয়া থাকে মনোরম, neither too hot nor too cold। দিনের আলো হয় মিষ্টি উজ্জ্বল, আর রাতের চাঁদনী বসন্তের মোহময় পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন নদী ও জলাশয় বসন্তে আরও উজ্জ্বল ও স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। শাপলা, পদ্মসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদও বসন্তে নতুন রূপ লাভ করে। নদীর পাড়ে গাছের সবুজ পাতার প্রতিচ্ছবি ও বাতাসের হালকা দোলায় পানির ঢেউ এক মায়াময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। বাংলার গ্রাম ও শহর বসন্তের আগমনে এক নতুন প্রাণ ফিরে পায়।

সরিষা ফুলের হলুদ মাঠ, ধানক্ষেতের কচি সবুজ চারাগাছ, তাল ও খেজুর গাছের কচি পাতা বসন্তের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। বসন্ত উৎসব উপলক্ষে রাস্তাঘাট, পার্ক, ক্যাম্পাস, বাগান সাজানো হয় বিভিন্ন রঙিন ফুল দিয়ে। বসন্ত প্রকৃতির নবজাগরণের ঋতু। এটি শুধু গাছপালা ও ফুলের পরিবর্তন নয়, বরং পাখির গান, বাতাসের মিষ্টি পরশ, নদীর কূলের স্নিগ্ধতা— সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। বসন্ত আমাদের শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগই দেয় না, বরং এটি আমাদের মনকেও আনন্দ ও সৃজনশীলতায় ভরিয়ে তোলে। বসন্ত ঋতুর আগমনে প্রকৃতির চেহারা বদলে যায়। শুষ্ক গাছগুলো নতুন পাতায় সজীব হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রকম ফুলের সমারোহে চারদিক রঙিন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বসন্তে যে পরিবর্তনগুলো লক্ষণীয়—শীতের কারণে ঝরে যাওয়া পাতা বসন্তের আগমনে নতুন কুঁড়ি ও সবুজ পত্রপল্লবে ভরে ওঠে। আম, কাঁঠাল, লিচু, কদম, কৃষ্ণচূড়া, পলাশ— এসব গাছে নতুন পাতা ও ফুল ফুটতে শুরু করে। বসন্তের প্রধান আকর্ষণ ফুল। এই ঋতুতে পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, গুলঞ্চ, কেয়া, বেলি, রজনীগন্ধা ইত্যাদি ফুল ফুটে। ফুলের রঙ ও সুবাস প্রকৃতিকে মোহনীয় করে তোলে। বসন্ত মানেই কোকিলের মধুর গান। এ সময় শুধু কোকিল নয়, দোয়েল, শ্যামা, টিয়া, ময়না, ফিঙে, বাবুই, শালিকের কণ্ঠেও ভরে ওঠে প্রকৃতি।
বাতাসের মৃদুমন্দ পরশ: বসন্তের হালকা মৃদু বাতাস শরীরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। এটি প্রকৃতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটায়।
বাংলাদেশে বসন্ত ফাল্গুন ও চৈত্র মাসজুড়ে স্থায়ী হয়। শীতের বিদায়ের পর বসন্তের উষ্ণতা অনুভূত হয়, তবে এটি তীব্র গরমের মতো নয়। আবহাওয়া থাকে মনোরম, neither too cold nor too hot। সূর্যের আলো হয় মিষ্টি উজ্জ্বল, বাতাস থাকে হালকা ও সতেজ। বসন্তের এই মনোরম পরিবেশ মানবমনেও এক স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ নিয়ে আসে। এ সময় প্রকৃতি যেমন নবজাগরণ লাভ করে, তেমনি মানুষের মনেও সৃষ্টিশীলতা ও নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়।

বাংলাদেশে বসন্ত শুধুমাত্র একটি ঋতুই নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বসন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান রয়েছে—বসন্তের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা ফাল্গুন বাংলাদেশে অত্যন্ত আনন্দঘনভাবে উদযাপিত হয়।
নারীরা বাসন্তী রঙের শাড়ি আর গাঁদা ফুলের মালা পরে উৎসবে যোগ দেন। তরুণরা পাঞ্জাবি পরে, ফুল হাতে রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও অন্যান্য স্থানে ঘুরে বেড়ায়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এই দিনে গান, কবিতা, নৃত্য ও নাটকের আয়োজন করে। আধুনিক সময়ে পহেলা ফাল্গুনের পাশাপাশি ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসও পালিত হয়। ফলে বসন্তের আনন্দের সঙ্গে প্রেম ও ভালোবাসার আবহও যুক্ত হয়। তরুণ-তরুণীরা এই দিনে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে। চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষের প্রস্তুতি বসন্তের শেষ মাস চৈত্র। এটি বাংলা বছরের শেষ মাস। চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবের মাধ্যমে পুরাতন বছরকে বিদায় জানানো হয় এবং নতুন বছরের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এ সময় গ্রামীণ মেলা, বিভিন্ন রকম হস্তশিল্প ও খাবারের আয়োজন হয়।
বসন্ত ঋতু বাংলা সাহিত্যে এক বিশাল প্রভাব ফেলেছে। কবি-সাহিত্যিকরা এই ঋতুর রূপ, রং, সুর ও সৌন্দর্যকে তাদের কাব্য, গান, উপন্যাস ও গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন। বসন্ত শুধু প্রকৃতির পরিবর্তন নয়, এটি মানুষের মনেও এক নতুন আবেগ, সৃজনশীলতা ও প্রেমের উদ্দীপনা জাগায়। তাই বাংলা সাহিত্যে বসন্তের উপস্থিতি এক বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তকে শুধু প্রকৃতির ঋতু হিসেবে দেখেননি, বরং এর সঙ্গে প্রেম, ভালোবাসা ও নবজাগরণের ভাবনা যুক্ত করেছেন। তার অসংখ্য কবিতা, গান ও গল্পে বসন্ত এসেছে এক অনন্য রূপে। তার বিখ্যাত গান “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো” বসন্তের শেষ লগ্নে গ্রীষ্মের আগমনকে উদযাপন করে। বসন্ত নিয়ে তার বিখ্যাত কবিতাগুলো হলো—
“বসন্ত এসে গেছে, বসন্ত এসে গেছে”
“ওরে গৃহবাসী, খুলে দে দ্বার, আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে”

রবীন্দ্রসংগীতে বসন্তের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার রচিত “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়”, “ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে”, “আজি ঝর ঝর মুখর বায়” ইত্যাদি গান বসন্ত উৎসবের অংশ হয়ে গেছে।

কাজী নজরুল ইসলামের লেখায় বসন্ত এসেছে এক উচ্ছ্বল, বর্ণিল ও বিপ্লবী রূপ নিয়ে। তার কবিতায় বসন্ত মানেই প্রাণচাঞ্চল্য, প্রেম, উচ্ছ্বাস ও বিদ্রোহের সমন্বয়।

তার বিখ্যাত কবিতা “আসছে বসন্ত, গাইবে ভুবন, ফাগুন লেগেছে বনে বনে”
বসন্তকে তিনি প্রেমের উন্মাদনা ও নতুন জীবনের বার্তা হিসেবে দেখেছেন—
“ফাগুনের আগুনে ঝর ঝর ঝরিছে পলাশ শিমুল”
“আজ বসন্ত জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে”
৩. জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বসন্ত

জীবনানন্দ দাশ বসন্তকে প্রকৃতির এক মায়াময় ও বিষণ্ন সৌন্দর্য হিসেবে দেখেছেন। তার কবিতায় বসন্ত শুধু রঙিন ফুলের নয়, বরং এক নৈঃশব্দ্যপূর্ণ, একাকীত্বময় অনুভূতিরও প্রতিচ্ছবি।

তার বিখ্যাত কবিতায় বসন্তের রূপ ধরা পড়ে—
“কিন্তু বসন্ত চলে যায়, কেবল প্রকৃতি থেকে যায়”।
“বনলতা সেন”-এ বসন্তের চিত্র ফুটে ওঠে, যেখানে কবি হারিয়ে যান প্রকৃতির মাঝে।
বাংলার লোকগান, পালাগান, বাউল গান ও ভাটিয়ালিতে বসন্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে— বসন্তের রঙ, প্রেম ও আধ্যাত্মিক ভাব ধরা পড়ে বাউল গানে।  গ্রামবাংলার বসন্ত উৎসবের আনন্দ ফুটে ওঠে এসব গানে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বসন্ত প্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অনেক উপন্যাস ও গল্পে বসন্তকে ভালোবাসা, নতুন জীবনের সূচনা ও প্রকৃতির পুনর্জন্ম হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

বসন্ত বাংলা সাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি কবিদের অনুপ্রাণিত করেছে, প্রেমিকের মনে ভালোবাসার অনুভূতি জাগিয়েছে, আর প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যকে সাহিত্যে চিরন্তন করে তুলেছে। বসন্ত তাই কেবল ঋতু নয়, এটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণ। বসন্ত কেবল একটি ঋতুই নয়, এটি সমাজ ও অর্থনীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে ফুল, পোশাক, গয়না, খাবারের দোকানগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। পোশাকের বাজারে হলুদ ও বাসন্তী রঙের পোশাকের চাহিদা বেড়ে যায়। বসন্তকালে দেশের বিভিন্ন পার্ক, উদ্যান, পর্যটনকেন্দ্রে ভিড় বাড়ে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজারের মতো স্থানগুলোতে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। বসন্ত উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নাটক, গান, কবিতা পাঠের আয়োজন করে। এতে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। যদিও বসন্ত আনন্দের ঋতু, তবু কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা দেয়। বসন্তে ধুলোবালির পরিমাণ বেড়ে যায়, যা অনেকের শ্বাসকষ্টের কারণ হয়।
বসন্তকালে অনেক গাছের পরাগায়ন শুরু হয়, যা অ্যালার্জির সমস্যা সৃষ্টি করে। বসন্ত শেষে তীব্র গরমের সূচনা হয়, যা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বসন্তের আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগের মতো বসন্তের দীর্ঘস্থায়িত্ব এখন আর নেই।
বসন্ত প্রকৃতির নবজাগরণের ঋতু। এটি শুধু ফুল, পাখি ও বাতাসের পরিবর্তন নিয়ে আসে না, বরং মানুষের মনেও এক নতুন আশার আলো জ্বালায়। বসন্তের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও আনন্দ আমাদের জীবনকে রঙিন করে তোলে। তাই, বসন্তের প্রকৃতি ও আবহ সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। বসন্ত হোক আনন্দের, সৃষ্টিশীলতার ও মানবতার উৎসব!

লেখক পরিচিতি : ‍উজ্জ্বল হোসাইন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, চাঁদপুর।

কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ
কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

কুড়িগ্রামে শীত ও ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারদিক। গত কয়েক দিন থেকে আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও নেই উত্তাপ।হাসপাতাল গুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সোমবার (১২জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এদিকে কুয়াশা ও শীতের তীব্রতার সঙ্গে উত্তরীয় হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। হাসপাতালে আসা চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের জোড়গাছ এলাকার খলিল মিয়া বলেন, আমার ছেলের কয়েক দিন থেকে ডায়েরি তাই ভর্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পৌর শহরের কলেজ পাড়া এলাকার হোটেল শ্রমিক জাহিদ মিয়া বলেন, সকাল বেলা ঠান্ডা ও শীতে বাড়িত থাকি বের হওয়া যায় না। কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়, দুস্থ মানুষদের মধ্যে কম্বল বিতরণ চলমান রয়েছে। রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, সোমবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই জারি করা হয়েছে এ সতর্কতা। ইসরায়েলের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মধ্যে টেলিফোনে বৈঠক হয়েছে। মূলত ইরান পরিস্থিতিই ছিল সেই ফোনালাপের একমাত্র বিষয়বস্তু। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে নেতানিয়াহু-রুবিওর আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে রুবিওর সঙ্গে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগের দিন শুক্রবার মার্কিন দৈনিক দ্য ইকোনমিস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে ইরান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, “আমার মনে হয় কোনো ধারণাগত মন্তব্য না করে আমাদের উচিত হবে ইরানে কী ঘটছে, তা দেখা। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলন বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ। এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার এবং গতকাল শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিযাত শাখা ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে নামানো হয়েছে। শনিবার রাতে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি।
তবে ইরানের চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুন মাসে ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। টানা ১২ দিন সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল সেবার।

লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

রায়পুরসহ লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের অভিযান থাকলেও ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় থামছে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৫টায় রায়পুর শহরের প্রধান সড়কে তিনটি ও সদরের দক্ষিণ বাজারের গোডাউন এলাকায় ৪টি অভিযানে সাতটি মামলায় মোট দশ ডিলারকে ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।পৃথক এই অভিযান পরিচালনা করেন রায়পুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন ও নিরুপম মজুমদার। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্যে সরকারি দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। গৃহিণী আফসানা বলেন, ‘টিভিতে দামের ঘোষণা শুনি, কিন্তু দোকানে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না।’ ক্রেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়ে হলেও সহজে গ্যাস পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।’ খুশবু আক্তার বলেন, ‘তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নিতে বাধ্য করছে।’
পরিবেশক মোহাম্মদ কাজল ও ফাহিম বলেন, ‘গোডাউনে চাহিদার চেয়ে মাল কম। কোম্পানি থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বাজারে দাম বাড়ানো বাধ্যতামূলক।’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামসুল বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে।’ রায়পুর উপজেলা পরিষদের সামনে পিঠা বিক্রেতা আরিফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দৈনিক দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে।’
ওমেরা ও যমুনা এলপিজির পরিবেশক বেলাল হোসেন বলেন, ‘ওমেরা ও যমুনা কোম্পানির কোনও সংকট নেই। পাইকারি দামে ১৩৮০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি দামের চেয়ে বেশি কেনা হচ্ছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর শহরের ৭ জনকে ৪২ হাজার ও রায়পুর শহরের ৩ জন ব্যাবসায়ীকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নিই। অভিযোগ পেলে জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, না হলে সিন্ডিকেট ভাঙ্গা কঠিন হবে।’
রায়পুর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লুধুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এলপিজি বাজারের অনিয়ম উদ্বেগজনক। সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি ও ভোক্তাদের সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। না হলে নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।’
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাছান বলেন, লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ও সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এলপিজি-এর সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কালে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে সদরে ৭টি মামলায় ৪২ হাজার টাকা এবং রায়পুরে তিন মামলায় ১১ হাজার টাকা অর্থদন্ড আদায় করা হয়েছে। জনস্বার্থে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রুখতে জেলা প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি ও অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।