খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

ফ্যাসিবাদের জামানায় শিকারি সাংবাদিক

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৫, ১১:২৮ অপরাহ্ণ
ফ্যাসিবাদের জামানায় শিকারি সাংবাদিক

ফ্যাসিবাদের যুগে সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত জটিল এবং বিপজ্জনক। ফ্যাসিবাদী শাসন সাধারণত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দমন করার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা স্থাপন ও রক্ষা করে। এই শাসনব্যবস্থায় সাংবাদিকদের কাজ শুধু কঠিনই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের “শিকারি” হিসেবে উল্লেখ করা যায়, যারা সত্য ও ন্যায়ের অনুসন্ধানে নিরন্তর কাজ করে, যদিও তারা নিজেরাই শিকার হয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদ হলো এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা, যা জাতীয়তাবাদ, সামরিকতন্ত্র এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপর সীমাবদ্ধতা আরোপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এটি সাধারণত একনায়কতন্ত্র, মতপ্রকাশের দমন, এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখে। ফ্যাসিবাদী সরকার মিডিয়াকে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়, যাতে জনগণ তাদের শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে। মতবিরোধ, সমালোচনা, বা সরকারের অপকর্ম প্রকাশ করার চেষ্টা করলে সাংবাদিকদের শারীরিক নির্যাতন, গ্রেফতার, এমনকি হত্যার শিকার হতে হয়।

সাংবাদিকতার ভূমিকা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে : সাংবাদিকতা হল গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এটি শাসকদের জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে এবং জনগণকে তথ্যসমৃদ্ধ করে। তবে ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে সাংবাদিকরা অনেক বাধার সম্মুখীন হন। এ ধরনের শাসনে সাংবাদিকদের মূল চ্যালেঞ্জ হল : ফ্যাসিবাদী শাসন সাধারণত সাংবাদিকদের উপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে। তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা প্রচার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদী শাসন তাদের প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য সাংবাদিকদের বাধ্য করে। এতে সাংবাদিকদের নৈতিকতার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। ফ্যাসিবাদী শাসকরা সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর জন্য গ্রেফতার, হুমকি এবং সহিংসতার আশ্রয় নেয়। অনেক সাংবাদিক নিখোঁজ বা নিহত হন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক সময় এই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা তাদের সমর্থনে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়।

ফ্যাসিবাদী শাসনে “শিকারি সাংবাদিক” বলতে এমন সাংবাদিকদের বোঝানো হয় যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য অনুসন্ধান করেন। তারা শাসকের ভয় দেখানো বা দুর্নীতির মুখোশ খুলে দিতে সচেষ্ট হন। কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপের মধ্যেও তারা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে সত্য তথ্য সংগ্রহ করেন এবং তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেন। অনেকে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে তা প্রকাশ করেন, যাতে তাদের নিজ দেশের আইন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়। শিকারি সাংবাদিকরা ব্লগ, সামাজিক মাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মতো বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের বার্তা পৌঁছান। এই সাংবাদিকরা জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। উদাহরণ: ফ্যাসিবাদের যুগে শিকারি সাংবাদিকদের সংগ্রাম ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে সাংবাদিকরা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন: হিটলারের শাসনামলে জার্মানিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিষিদ্ধ করা হয়। তারপরও কিছু সাংবাদিক, যেমন কার্ল ফন অসিয়েতস্কি, তাদের লেখার মাধ্যমে নাৎসি শাসনের অব্যবস্থাপনা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রকাশ করেন। এর জন্য তাদের জেল, নির্যাতন এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। স্তালিনের আমলে সংবাদ মাধ্যম কেবলমাত্র শাসকের হাতিয়ার ছিল। তবুও কিছু সাংবাদিক, যেমন আনা পলিটকোভস্কায়া, তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য উদ্ঘাটন করেন। মিয়ানমারে, বেলারুশে এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে সাংবাদিকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তবুও শিকারি সাংবাদিকরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যেমন মিয়ানমারের উইন টিন এবং বেলারুশের মারিয়া রাসোলভা।

ফ্যাসিবাদের যুগে সাংবাদিকদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল তাদের নিরাপত্তা। রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট শক্তি প্রায়শই তাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে সাংবাদিকরা নতুন নতুন উপায়ে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফ্যাসিবাদী সরকাররা নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের উপর নজরদারি করে এবং তাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় সাধারণ মানুষও ভয়ে সাংবাদিকদের সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানায়। ন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি, যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস, সাংবাদিকদের রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সাংবাদিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, যা সেন্সরশিপ এড়াতে সহায়।

ফ্যাসিবাদের যুগে শিকারি সাংবাদিকরা শুধুমাত্র পেশাদার নন; তারা সমাজের জন্য একজন যোদ্ধা। তাদের কাজের মাধ্যমে তারা শুধু সত্য উদ্ঘাটন করেন না, বরং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেন এবং শাসকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সাহায্য করেন। যদিও তাদের পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ, তবুও তাদের আত্মত্যাগ মানবজাতির জন্য অনুপ্রেরণা। একবিংশ শতাব্দীতে, যখন ফ্যাসিবাদের নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে, তখন এই শিকারি সাংবাদিকরাই আমাদের গণতন্ত্রের প্রতিরক্ষক।

ফ্যাসিবাদের যুগে শিকারি সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে আরো গভীর বিশ্লেষণ যোগ করা যেতে পারে, যা সাংবাদিকতার নৈতিকতা, ফ্যাসিবাদী সরকারের কৌশল, এবং সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত সংগ্রামের দিকগুলোকে বিশদভাবে আলোচনা করবো।ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা সাধারণত তিনটি মূল বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে দমন করে। ফ্যাসিবাদী সরকার সংবাদ মাধ্যমের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। তারা এমন সংবাদ প্রচার করতে বাধ্য করে যা শাসকদের সুনাম বাড়ায় এবং জনগণের মধ্যে ভয় বা একত্রীকরণ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, নাৎসি জার্মানিতে জোসেফ গোয়েবেলসের প্রোপাগান্ডা মেশিন “ফ্রিহার প্রেস” নামমাত্র স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমকে সম্পূর্ণরূপে দমন করেছিল। সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর জন্য শারীরিক আক্রমণ, বিচারহীন গ্রেপ্তার, এমনকি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। মেক্সিকো, ফিলিপাইন, এবং তুরস্কের মতো দেশে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে। ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিকরা ফ্যাসিবাদী সরকারের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে বিবেচিত হন।

অনেক ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সংবাদ মাধ্যমকে তাদের “রাষ্ট্রের যুদ্ধ” নীতি বাস্তবায়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সামরিকীকৃত প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, এবং শাসকদের কর্তৃত্বকে সঠিক প্রমাণ করা হয়। ঝুঁকি ও নৈতিকতার প্রশ্নে ফ্যাসিবাদী শাসনে সাংবাদিকদের কাজ শুধু তথ্য সংগ্রহ বা প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ একটি যুদ্ধ। ফ্যাসিবাদের অধীনে সাংবাদিকরা প্রায়শই পছন্দের দুই পথের মুখোমুখি হন: শাসকের সাথে আপস করে কাজ চালিয়ে যাওয়া। বা সত্য উদঘাটনের জন্য জীবন, পরিবার এবং পেশা সবকিছুর ঝুঁকি নেওয়া।

আলোচিত কয়েকটি উদাহরণ : ড্যাফনে কারুয়ানা গ্যালিজিয়া (মাল্টা): তিনি মাল্টার শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন। ২০১৭ সালে বোমা হামলায় তার মৃত্যু ঘটে।জামাল খাশোগি (সৌদি আরব): সৌদি সরকারের নীতির সমালোচনা করার জন্য ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়।

ফ্যাসিবাদী সরকারের অধীনে কাজ করা সাংবাদিকদের নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাদার নীতিবোধের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়। ফ্যাসিবাদী শাসকের চাপের মুখে কিছু সাংবাদিক বাধ্য হন সরকারের পক্ষে লিখতে। অন্যদিকে, যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তারা প্রায়শই নিজেদের এবং তাদের পরিবারের জীবন বিপন্ন করে। শিকারি সাংবাদিকদের শক্তি ও কৌশল শিকারি সাংবাদিকরা একদিকে শাসকদের প্রোপাগান্ডার মুখোশ উন্মোচন করেন, অন্যদিকে তারা জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেন। তাদের প্রতিরোধের কিছু কৌশল হলো:গোপন সংবাদ সংযোগ:কিছু সাংবাদিক সরকার-নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যম এড়িয়ে বিকল্প উপায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করেন। তারা নির্ভর করেন অনলাইন মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার ওপর।

প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে ফ্যাসিবাদী শাসকদের সেন্সরশিপ এড়ানোর নতুন পথ তৈরি হয়েছে। এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকরা তথ্য সরবরাহ করে থাকেন। ফ্যাসিবাদী শাসনে কাজ করা সাংবাদিকরা প্রায়শই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতো সংস্থাগুলি সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করে।

শিকারি সাংবাদিকদের ভূমিকা শুধু তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী সচেতনতা তৈরি করেন, যা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়।সাংবাদিকরা ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যায়, দুর্নীতি, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন তুলে ধরে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ফ্যাসিবাদী সরকার তথ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণকে অজ্ঞ করে রাখার চেষ্টা করে। সাংবাদিকরা সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সাহস এবং সচেতনতা তৈরি করেন।

অনেক সময় ফ্যাসিবাদী শাসন পতনের পর সাংবাদিকরা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করেন। তারা নথিভুক্ত করেন যে কীভাবে একটি জাতি ফ্যাসিবাদের করালগ্রাসে পড়েছিল এবং সেখান থেকে মুক্তি লাভ করেছিল।

ফ্যাসিবাদের যুগে সাংবাদিকদের ভূমিকা কেবলমাত্র একটি পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নৈতিক, রাজনৈতিক, এবং সামাজিক দায়িত্ব। শিকারি সাংবাদিকরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবতার স্বার্থে কাজ করেন। তারা কেবল শাসকদের বিরুদ্ধে নয়, বরং জনগণের উদাসীনতা এবং ভয়কেও চ্যালেঞ্জ জানায়।

যখন ফ্যাসিবাদ সব কিছুকে দমন করতে চায়, তখন এই সাংবাদিকরাই সমাজের অন্ধকার সময়ে আলোর ঝলকানি হয়ে ওঠে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সত্যের অনুসন্ধানীরা শাসকদের ভয় পায় না। তাদের আত্মত্যাগ ও সাহস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনো সহজে পাওয়া যায় না।

লেখক : উজ্জ্বল হোসাইন, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ২০২১ ব্যাচ, বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট (পিআইবি)।

 

হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
হামের প্রকোপে ২৪ ঘণ্টায় ৯ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত সহস্রাধিক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামজনিত কারণে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাকি ৮ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১১০৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ১৭৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের। এতে বোঝা যাচ্ছে রাজধানীতে সংক্রমণের হার ও তীব্রতা সবথেকে বেশি। গত এক মাসে মোট ১৮,২৩১ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে, যার মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯,৩০৪ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ক্রমান্বয়ে জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে উপসর্গ নিয়ে
শিশুদের শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেল থেকে চট্টগ্রামের এই কারখানাটিতে পরিশোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরএল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শোধনাগারটি সচল রাখতে গত কয়েকদিন ধরে বিকল্প সব পথ অবলম্বন করা হয়েছিল:
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা ৫ হাজার টন এবং চারটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা ‘ডেড স্টক’ তুলেও পরিশোধন কাজ চালানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করলেও, সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ থেকেই ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুদ ২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে, যা একটি শোধনাগার চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে কি না—এমন উদ্বেগের মুখে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানয়েছে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইআরএল বন্ধ থাকলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বা বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত এবং বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর একটি বড় অংশই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হলেও, অভ্যন্তরীণভাবে তেল পরিশোধনের একমাত্র উৎসটি বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
বর্ষবরণে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সন্ধান

ভিন্নতা মুছে ফেলার চেষ্টা মানেই প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই পৃথিবীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে-রঙে, রূপে, ভাষায়, বিশ্বাসে এবং চিন্তার বহুমাত্রিকতায়। মানুষে মানুষে পার্থক্যই পৃথিবীকে জীবন্ত করে তোলে, তাকে দেয় গভীরতা ও বিস্ময়ের অনন্ত সম্ভাবনা। যদি সবকিছু একরকম হয়ে যেত, তবে জীবন হয়ে উঠত নিস্তরঙ্গ, সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে ফেলত তার আলো। বৈচিত্র্য আমাদের শুধু আলাদা করে না, বরং আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নতুনকে গ্রহণ করার সাহস। তাই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে গ্রহণ ও লালন করাই মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
এই ভাবনার মাঝেই আসে বাংলা নববর্ষ, নতুন সূচনার বার্তা নিয়ে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান জানায় এই উৎসব। রঙিন পহেলা বৈশাখে মানুষ যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঘরে ঘরে সাজে উৎসবের আবহ, তখন এই আনন্দ যেন সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের একাংশে যখন উৎসবের রং ছড়ায়, অন্য প্রান্তে তখন জমে ওঠে শোক, বেদনা আর হতাশার কালো ছায়া। যেন উৎসবের আলো কোথাও গিয়ে আটকে যায় বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার দেয়ালে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মৃত্যুর আগে বারবার নিজের কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই মানবিক আবেদন হারিয়ে যায় উন্মত্ত জনতার চিৎকারে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। আমাদের সমাজে ক্রমেই একমুখী চিন্তা ও মতের প্রাধান্য বাড়ছে। বহুত্ববাদ, যা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি, তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতের ভিন্নতা এবং সেই ভিন্নতার সহাবস্থান। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ভিন্নমতকে ক্রমেই দমন করা হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে তা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নিজের মত প্রকাশে ভয় পাচ্ছে, দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ করে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে-আমরা কি সেই আদর্শের পথে আছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? ১৯৭১ সালের সংগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সহাবস্থানের এক স্বপ্ন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি ক্রমশ সরে যাচ্ছি সেই পথ থেকে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকীর্ণতা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলেছে, কিন্তু চরিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকীর্ণতা আরও তীব্র হয়েছে। ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে, আর রাজনীতি হয়ে উঠেছে বিভাজনের হাতিয়ার। প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের নামে সমাজকে আরও বিভক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজনীতিকরা প্রায়ই ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি এবং শান্তির কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলো অনেক সময়ই বাস্তব উদ্যোগের অভাবে ফাঁপা বাণীতে পরিণত হয়। যখন আদর্শ ও নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থ হারায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে।
এই বাস্তবতায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে-আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নমত দমন করা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও নিশ্চিত হবে? বৈচিত্র্যকে ভয় পেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।
সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভিন্নতাকে সম্মান করার গুরুত্ব। সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ম, ভাষা বা মতের পার্থক্য নয়-মানুষ হিসেবে আমাদের অভিন্ন পরিচয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

বাংলা নববর্ষের এই সময় তাই শুধু আনন্দের নয়, আত্মসমালোচনারও। নতুন বছরের শুরুতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা বৈচিত্র্যকে রক্ষা করব, সহনশীলতাকে শক্তিশালী করব এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলব। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে মাপা যায় না; তা মাপা যায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের মানদণ্ডে।
নতুন বছরের সূচনায় তাই প্রত্যাশা একটাই – বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, বিভেদের মাঝে সহমর্মিতা, আর সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের এক নতুন বাংলাদেশ।
রূপসী বাংলার সকল পাঠক-কে শুভ নববর্ষ।