খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১ মাঘ, ১৪৩২

সংবাদ না বয়ান : গণমাধ্যমের ঝোঁক ও ঝুঁকি

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৫, ৫:৪৭ অপরাহ্ণ
সংবাদ না বয়ান : গণমাধ্যমের ঝোঁক ও ঝুঁকি

গণমাধ্যম সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। এর ভূমিকা নিরপেক্ষ ও সত্য সংবাদ পরিবেশন করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। গণমাধ্যম কি শুধু খবর পৌঁছে দিচ্ছে, নাকি নিজের বয়ান তৈরি করছে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হলে আমাদের গণমাধ্যমের ঝোঁক, তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং এর ফলে সৃষ্ট ঝুঁকিগুলোকে মূল্যায়ন করতে হবে।

গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো জনগণকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করা। কিন্তু দিন দিন আমরা লক্ষ্য করছি, সংবাদ পরিবেশনে নিরপেক্ষতার অভাব এবং পক্ষপাতিত্বের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সংবাদ আর তথ্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট মতবাদ বা বয়ানের রূপ নিচ্ছে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে, গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এখন ব্যবসায়িক মডেলের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞাপনদাতা এবং পৃষ্ঠপোষকদের চাপে তারা এমন খবর পরিবেশন করে যা জনমত প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে, সংবাদ পরিবেশনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো গল্প বা বয়ান তৈরি করছে যা তাদের আর্থিক স্বার্থে সহায়ক। গণমাধ্যমের একটি অংশ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা মতবাদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে। তারা একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে সংবাদ পরিবেশন করে, যেখানে তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে জনগণ বিভ্রান্ত হয় এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পায়। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিযোগিতার কারণে অনেক গণমাধ্যম “সংবাদের” পরিবর্তে “সেনসেশন” পরিবেশনে ঝুঁকছে। টিআরপি বাড়ানোর জন্য নাটকীয় এবং উত্তেজনাপূর্ণ খবর পরিবেশনের প্রবণতা বেড়ে গেছে। ফলে সত্য ঘটনা আড়ালে থেকে যায়।

সংবাদ হলো নিরপেক্ষ তথ্য উপস্থাপন। এটি কোনো মতামত বা অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে নয়। বয়ান, অন্যদিকে, একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তা উপস্থাপন করে। তবে গণমাধ্যম যখন সংবাদকে বয়ান হিসেবে রূপান্তরিত করে, তখন এটি একটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ-একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির খবর যখন নিরপেক্ষভাবে পরিবেশন করা হয়, তখন এটি সংবাদ। কিন্তু সেই খবর যখন একটি দলের সাফল্যের গল্প হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তখন তা বয়ানে রূপান্তরিত হয়।

তেমনই, একটি সামাজিক ইস্যুকে অযথা সেনসেশন তৈরি করে পরিবেশন করাও বয়ানের আরেকটি উদাহরণ । গণমাধ্যমের এই ঝোঁক সমাজ, রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। এর ফলে: পক্ষপাতদুষ্ট বয়ান সমাজকে বিভক্ত করে। মানুষ নিরপেক্ষ খবর পাওয়ার পরিবর্তে পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।গণমাধ্যম যদি বয়ান তৈরিতে মনোযোগ দেয়, তাহলে তথ্যের বিকৃতি ঘটতে পারে। এর ফলে ভ্রান্ত তথ্যের প্রসার ঘটে এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।

গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। যখন জনগণ গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ হিসেবে দেখতে পায় না, তখন এটি তার প্রভাব হারায়।

গণমাধ্যমের ভূমিকা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। কিন্তু যখন এটি নিরপেক্ষতার পরিবর্তে পক্ষপাতিত্ব করে, তখন এটি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গণমাধ্যমের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ থেকে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। সেনসেশনাল খবরের পরিবর্তে গবেষণাধর্মী এবং তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।জনগণকে সচেতন হতে হবে। পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য বুঝতে এবং সঠিক তথ্য খুঁজে বের করতে দক্ষ হতে হবে।

গণমাধ্যমকে স্বচ্ছ হতে হবে। তাদের উৎস, গবেষণার প্রক্রিয়া এবং খবর প্রকাশের কারণগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে।সামাজিক মাধ্যমে ভ্রান্ত তথ্যের বিস্তার রোধে গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করতে হবে।

গণমাধ্যম মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। সংবাদ পরিবেশন করার মাধ্যমে এটি শুধু তথ্য সরবরাহ করে না, বরং জনমত তৈরিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তবে, গণমাধ্যম যখন সংবাদকে বয়ানে পরিণত করে, তখন এটি তার প্রাথমিক দায়িত্ব থেকে সরে আসে। এতে সাংবাদিকতার মূলনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি সমাজে বিভাজন ও ভুল বোঝাবুঝির জন্ম হয়।
গণমাধ্যমের কার্যক্রম আর আগের মতো সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে প্রিন্ট মিডিয়া ও টেলিভিশন যেমন সংবাদ পরিবেশন করছে, অন্যদিকে ডিজিটাল মাধ্যম সমাজে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মুহূর্তের মধ্যেই খবর মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য পরিবেশনের প্রবণতাও বাড়ছে।

আজকের গণমাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সত্যকে বিকৃত করে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, যা দর্শক বা পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। এটি শুধু তথ্যের অভাব তৈরি করে না, বরং মানুষের মস্তিষ্কে এমন একটি বয়ান তৈরি করে, যা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে পূরণ করে। গণমাধ্যমের বয়ান তৈরি করার পিছনে কিছু নির্দিষ্ট ঝোঁক কাজ করে। এ প্রসঙ্গে কিছু বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো-গণমাধ্যম অনেকাংশে এখন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞাপনদাতা এবং কর্পোরেট স্বার্থের কারণে গণমাধ্যম নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সংবাদ পরিবেশনের ধরণ নির্ধারিত হয় পৃষ্ঠপোষকদের চাহিদা অনুযায়ী।

গণমাধ্যম অনেক সময় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে খবর পরিবেশন করে। এর ফলে, প্রকৃত ঘটনা আড়ালে চলে যায় এবং বয়ান তৈরি হয়, যা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে সমর্থন করে।

টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন পোর্টালগুলোর জন্য দর্শক ধরে রাখা বা বেশি ভিউয়ারশিপ পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা বেশি দর্শক টানার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ এবং সংবেদনশীল খবর পরিবেশন করে। এতে তথ্যের মান ও সত্যতা উপেক্ষিত হয়। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের উত্থান গণমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দ্রুত এবং ক্লিক-বেইট শিরোনামে খবর প্রকাশ করার তাড়নায় গণমাধ্যম অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই খবর প্রকাশ করে।

সংবাদ যখন বয়ানে রূপান্তরিত হয়, তখন তা মানুষের মননে গভীর প্রভাব ফেলে। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে অনেক সময় এমনভাবে খবর প্রচারিত হয়, যা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার করে খবর পরিবেশনের ফলে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি হয়।নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট দলের প্রচারণার অংশ হিসেবে খবর পরিবেশিত হয়। এতে ভোটাররা বিভ্রান্ত হন এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।দারিদ্র্য, নারী নির্যাতন বা পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে গণমাধ্যমে কখনো সত্যকে অতিরঞ্জিত করে বা সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রকৃত সমাধান খোঁজার পরিবর্তে সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে।

গণমাধ্যমের বয়ান তৈরির ঝুঁকি বহুমাত্রিক। এর কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হলো : যখন সংবাদকে নিরপেক্ষভাবে পরিবেশন করা হয় না, তখন তা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে মানুষ ভিন্নমত গ্রহণ করতে পারে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ব্যাহত হয়। গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব জনগণকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। এর ফলে নির্বাচন বা নীতি নির্ধারণের মতো প্রক্রিয়াগুলো প্রভাবিত হয়।

গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা হারালে মানুষের আস্থা কমে যায়। এর ফলে, তারা প্রকৃত তথ্যের জন্য বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা সব সময় বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে।

বয়ান তৈরি করে জনগণকে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শে পরিচালিত করা হলে, দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এই সংকট মোকাবিলায় গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিচে উল্লেখ করা হলো : গণমাধ্যমকে অবশ্যই সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে। সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য সরবরাহ করা এবং পক্ষপাত এড়ানো এর মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।

গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকতে হবে। গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশিত হলে, তা বয়ান তৈরির পরিবর্তে সত্য প্রকাশে সহায়ক হবে।
ফ্যাক্ট-চেকিং টুল এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংবাদ যাচাই করা উচিত, বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত খবরের ক্ষেত্রে।
গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল থাকার পাশাপাশি জনগণকেও তথ্য যাচাই করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সচেতন পাঠক ও দর্শক তৈরি হলে, পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের প্রচার সীমিত হবে।
গণমাধ্যম শুধু খবর পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার। কিন্তু এই হাতিয়ার যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত না হয়, তাহলে এটি সমাজে অস্থিরতা এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। সংবাদ এবং বয়ানের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে না পারলে আমরা সত্যকে হারিয়ে ফেলব।

গণমাধ্যমকে অবশ্যই তার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করতে হবে: নিরপেক্ষ ও সত্য সংবাদ সরবরাহ। পক্ষপাতিত্ব, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাব এড়িয়ে যদি গণমাধ্যম কাজ করতে পারে, তবে তা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। অন্যদিকে, জনগণকেও সচেতন হতে হবে এবং সঠিক তথ্যের জন্য বিভিন্ন উৎস যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং জনগণের সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করলে সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।গণমাধ্যমের ভূমিকা হলো সমাজকে তথ্যের মাধ্যমে আলোকিত করা। কিন্তু যখন গণমাধ্যম সংবাদকে বয়ানে পরিণত করে, তখন এটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। তাই গণমাধ্যমকে নিজের মূল দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে, জনগণকেও সচেতন হতে হবে, যাতে তারা সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদ গ্রহণ করতে পারে।

গণমাধ্যম যখন সত্য, নিরপেক্ষতা এবং নৈতিকতার পথে অটল থাকবে, তখনই এটি তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে। অন্যথায়, গণমাধ্যমের বয়ান সমাজে বিভ্রান্তি এবং বিভাজন সৃষ্টি করতে থাকবে।

লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, গণমাধ্যম সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ২০২১, পিআইবি।

কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ
কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

কুড়িগ্রামে শীত ও ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারদিক। গত কয়েক দিন থেকে আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও নেই উত্তাপ।হাসপাতাল গুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সোমবার (১২জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এদিকে কুয়াশা ও শীতের তীব্রতার সঙ্গে উত্তরীয় হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। হাসপাতালে আসা চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের জোড়গাছ এলাকার খলিল মিয়া বলেন, আমার ছেলের কয়েক দিন থেকে ডায়েরি তাই ভর্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পৌর শহরের কলেজ পাড়া এলাকার হোটেল শ্রমিক জাহিদ মিয়া বলেন, সকাল বেলা ঠান্ডা ও শীতে বাড়িত থাকি বের হওয়া যায় না। কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়, দুস্থ মানুষদের মধ্যে কম্বল বিতরণ চলমান রয়েছে। রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, সোমবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই জারি করা হয়েছে এ সতর্কতা। ইসরায়েলের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মধ্যে টেলিফোনে বৈঠক হয়েছে। মূলত ইরান পরিস্থিতিই ছিল সেই ফোনালাপের একমাত্র বিষয়বস্তু। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে নেতানিয়াহু-রুবিওর আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে রুবিওর সঙ্গে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগের দিন শুক্রবার মার্কিন দৈনিক দ্য ইকোনমিস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে ইরান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, “আমার মনে হয় কোনো ধারণাগত মন্তব্য না করে আমাদের উচিত হবে ইরানে কী ঘটছে, তা দেখা। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলন বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ। এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার এবং গতকাল শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিযাত শাখা ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে নামানো হয়েছে। শনিবার রাতে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি।
তবে ইরানের চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুন মাসে ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। টানা ১২ দিন সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল সেবার।

লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

রায়পুরসহ লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের অভিযান থাকলেও ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় থামছে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৫টায় রায়পুর শহরের প্রধান সড়কে তিনটি ও সদরের দক্ষিণ বাজারের গোডাউন এলাকায় ৪টি অভিযানে সাতটি মামলায় মোট দশ ডিলারকে ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।পৃথক এই অভিযান পরিচালনা করেন রায়পুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন ও নিরুপম মজুমদার। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্যে সরকারি দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। গৃহিণী আফসানা বলেন, ‘টিভিতে দামের ঘোষণা শুনি, কিন্তু দোকানে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না।’ ক্রেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়ে হলেও সহজে গ্যাস পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।’ খুশবু আক্তার বলেন, ‘তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নিতে বাধ্য করছে।’
পরিবেশক মোহাম্মদ কাজল ও ফাহিম বলেন, ‘গোডাউনে চাহিদার চেয়ে মাল কম। কোম্পানি থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বাজারে দাম বাড়ানো বাধ্যতামূলক।’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামসুল বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে।’ রায়পুর উপজেলা পরিষদের সামনে পিঠা বিক্রেতা আরিফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দৈনিক দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে।’
ওমেরা ও যমুনা এলপিজির পরিবেশক বেলাল হোসেন বলেন, ‘ওমেরা ও যমুনা কোম্পানির কোনও সংকট নেই। পাইকারি দামে ১৩৮০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি দামের চেয়ে বেশি কেনা হচ্ছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর শহরের ৭ জনকে ৪২ হাজার ও রায়পুর শহরের ৩ জন ব্যাবসায়ীকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নিই। অভিযোগ পেলে জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, না হলে সিন্ডিকেট ভাঙ্গা কঠিন হবে।’
রায়পুর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লুধুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এলপিজি বাজারের অনিয়ম উদ্বেগজনক। সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি ও ভোক্তাদের সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। না হলে নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।’
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাছান বলেন, লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ও সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এলপিজি-এর সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কালে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে সদরে ৭টি মামলায় ৪২ হাজার টাকা এবং রায়পুরে তিন মামলায় ১১ হাজার টাকা অর্থদন্ড আদায় করা হয়েছে। জনস্বার্থে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রুখতে জেলা প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি ও অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।