খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১ মাঘ, ১৪৩২

বর্তমান বাংলাদেশে প্রেক্ষাপটে জনতন্ত্র ও গণতন্ত্র

উজ্জ্বল হোসাইন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১২:২১ অপরাহ্ণ
বর্তমান বাংলাদেশে প্রেক্ষাপটে জনতন্ত্র ও গণতন্ত্র

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যার সংবিধানে জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। তবে স্বাধীনতার পর থেকে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চর্চা নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। সামরিক শাসন, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে (২০২৫ সাল) বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবস্থা এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মানবাধিকার, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এই প্রবন্ধে বর্তমান বাংলাদেশের জনতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বিশদ বিশ্লেষণ করা হবে। গণতন্ত্র বলতে বোঝায় এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়। এতে মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করা হয়।বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : “প্রজাতন্ত্রে গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবাধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠিত হইবে এবং মানব মর্যাদা ও মূল্যবোধ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হইবে।”–

জনগণের ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন।  সকল নাগরিক ও রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান আইনের অধীন। জনগণ স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করে। দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রের ধারা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন (বাকশাল), ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন, এবং পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছে। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক চর্চা বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।

 ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল, যা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতা, অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো কার্যকর বিরোধী দল ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। তবে বাংলাদেশে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক সমাবেশ ও আন্দোলনে বাধা দেওয়া হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কমে গেছে, যা গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের একটি প্রধান স্তম্ভ হলো আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা।

প্রাসঙ্গিক চ্যালেঞ্জ: রাজনৈতিক প্রভাব: বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন: বেআইনি আটক, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগ আছে। দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচারের ঘাটতি: মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারের ধীরগতি নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ।
গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো মুক্ত গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮) সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সীমিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেলফ-সেন্সরশিপ: অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সরকারবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করতে সতর্ক থাকে। নাগরিক স্বাধীনতা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতপ্রকাশের জন্য মামলা ও গ্রেফতার বেড়েছে। সুশাসন ও দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সফলতার জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন অপরিহার্য। সরকারি-বেসরকারি খাতে দুর্নীতির বিস্তার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারী নীতিমালা গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশাসনিক সেবায় অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষণীয়।

গণতন্ত্র সুসংহত করার উপায় : সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা। শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা। নির্বাচনে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন বা বাতিল করা। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। গণমাধ্যমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানো। দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া। সরকারি খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গঠন করা। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা। যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণের গণতান্ত্রিক চর্চায় সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা

বাংলাদেশের বর্তমান গণতন্ত্রের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে হলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক কাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা, মানবাধিকার, প্রশাসনিক কার্যক্রম, এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এ প্রবন্ধের আগের অংশে আমরা বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন আমরা আরও গভীরে গিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে পর্যালোচনা করব। বাংলাদেশ একটি সংসদীয় গণতন্ত্র, যেখানে সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী ক্ষমতার সর্বোচ্চ নেতা। তবে বাস্তবিক অর্থে রাজনৈতিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে গণতন্ত্রের মৌলিক আদর্শ মেনে চলছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী) অত্যন্ত শক্তিশালী, ফলে নির্বাহী শাখার কার্যক্রম এককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো আইন প্রণয়ন এবং সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা। বর্তমানে সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ বিরোধী দলের উপস্থিতি ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। সংসদীয় বিতর্ক কমে গেছে, যার ফলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয় না।
বাংলাদেশে প্রধানত দুটি বড় রাজনৈতিক দল সক্রিয়: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই দুটি দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলমান, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের অভাব গণতন্ত্রের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও দমননীতি: বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি দমন করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা হয় বলে সমালোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো নির্বাচন। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা কম থাকে। কিছু ক্ষেত্রে ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

EVM ব্যবহারের বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, EVM-এর মাধ্যমে কারচুপি করা সম্ভব। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার ব্যবস্থার ওপর সরকারি প্রভাব রয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, অথচ সাধারণ মানুষের মামলা বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সরকারবিরোধী মত প্রকাশ করলে মামলা ও গ্রেফতারের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাংবাদিক, বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। গণতন্ত্রের একটি মূল স্তম্ভ হলো মুক্ত গণমাধ্যম। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
সরকার-বিরোধী সংবাদ প্রকাশ করলে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে পড়ে। কিছু টেলিভিশন ও সংবাদপত্র সরকারের অনুকূলে থাকার কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৮ সালে প্রণীত এই আইন ইন্টারনেটে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করেছে। এই আইনের অধীনে অনেক সাংবাদিক ও নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেক সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক চাপের কারণে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে সাহস পায় না। গণতন্ত্র শুধু কেন্দ্রীয় সরকার পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, এটি স্থানীয় পর্যায়েও কার্যকর হতে হবে।

প্রধান সমস্যা: ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব বেশি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সাধারণ মানুষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারে না। স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি দমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ ও অনিয়ম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে নাগরিক সেবা পেতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতি প্রশাসনে দুর্নীতির অন্যতম কারণ। বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সব সময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। দুর্নীতিবাজদের শাস্তির হার তুলনামূলক কম।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকে থাকলেও তা কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এখনো অনেক কাজ বাকি। স্বচ্ছ নির্বাচন, কার্যকর সংসদ, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকে আছে, তবে তা কার্যকর ও শক্তিশালী গণতন্ত্র হয়ে উঠতে হলে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্র দুর্বল হতে পারে। জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। দেশ এগিয়ে নিতে হলে দায়িত্বশীল রাজনীতি, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা জরুরি।

লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, লেখক ও সাংবাদিক, চাঁদপুর।

কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ
কুড়িগ্রামে শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি

কুড়িগ্রামে শীত ও ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারদিক। গত কয়েক দিন থেকে আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও নেই উত্তাপ।হাসপাতাল গুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সোমবার (১২জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এদিকে কুয়াশা ও শীতের তীব্রতার সঙ্গে উত্তরীয় হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। হাসপাতালে আসা চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের জোড়গাছ এলাকার খলিল মিয়া বলেন, আমার ছেলের কয়েক দিন থেকে ডায়েরি তাই ভর্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পৌর শহরের কলেজ পাড়া এলাকার হোটেল শ্রমিক জাহিদ মিয়া বলেন, সকাল বেলা ঠান্ডা ও শীতে বাড়িত থাকি বের হওয়া যায় না। কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়, দুস্থ মানুষদের মধ্যে কম্বল বিতরণ চলমান রয়েছে। রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, সোমবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান অশান্ত, ইসরায়েলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই জারি করা হয়েছে এ সতর্কতা। ইসরায়েলের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মধ্যে টেলিফোনে বৈঠক হয়েছে। মূলত ইরান পরিস্থিতিই ছিল সেই ফোনালাপের একমাত্র বিষয়বস্তু। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে নেতানিয়াহু-রুবিওর আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে রুবিওর সঙ্গে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগের দিন শুক্রবার মার্কিন দৈনিক দ্য ইকোনমিস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে ইরান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, “আমার মনে হয় কোনো ধারণাগত মন্তব্য না করে আমাদের উচিত হবে ইরানে কী ঘটছে, তা দেখা। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলন বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ। এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার এবং গতকাল শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিযাত শাখা ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে নামানো হয়েছে। শনিবার রাতে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি।
তবে ইরানের চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুন মাসে ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল ও ইরান। টানা ১২ দিন সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল সেবার।

লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাস সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি, দশ ডিলারের জরিমানা

রায়পুরসহ লক্ষ্মীপুর জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের অভিযান থাকলেও ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় থামছে না।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৫টায় রায়পুর শহরের প্রধান সড়কে তিনটি ও সদরের দক্ষিণ বাজারের গোডাউন এলাকায় ৪টি অভিযানে সাতটি মামলায় মোট দশ ডিলারকে ৪৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।পৃথক এই অভিযান পরিচালনা করেন রায়পুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসান মুহাম্মদ নাহিদ শেখ সুমন ও নিরুপম মজুমদার। ভোক্তারা অভিযোগ করেন, ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্যে সরকারি দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। গৃহিণী আফসানা বলেন, ‘টিভিতে দামের ঘোষণা শুনি, কিন্তু দোকানে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না।’ ক্রেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়ে হলেও সহজে গ্যাস পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।’ খুশবু আক্তার বলেন, ‘তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি দাম নিতে বাধ্য করছে।’
পরিবেশক মোহাম্মদ কাজল ও ফাহিম বলেন, ‘গোডাউনে চাহিদার চেয়ে মাল কম। কোম্পানি থেকে বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বাজারে দাম বাড়ানো বাধ্যতামূলক।’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামসুল বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে।’ রায়পুর উপজেলা পরিষদের সামনে পিঠা বিক্রেতা আরিফ হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দৈনিক দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে।’
ওমেরা ও যমুনা এলপিজির পরিবেশক বেলাল হোসেন বলেন, ‘ওমেরা ও যমুনা কোম্পানির কোনও সংকট নেই। পাইকারি দামে ১৩৮০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি দামের চেয়ে বেশি কেনা হচ্ছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুর শহরের ৭ জনকে ৪২ হাজার ও রায়পুর শহরের ৩ জন ব্যাবসায়ীকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নিই। অভিযোগ পেলে জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, না হলে সিন্ডিকেট ভাঙ্গা কঠিন হবে।’
রায়পুর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লুধুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এলপিজি বাজারের অনিয়ম উদ্বেগজনক। সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি ও ভোক্তাদের সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। না হলে নির্ধারিত দাম কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।’
জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাছান বলেন, লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ও সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে এলপিজি-এর সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কালে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে সদরে ৭টি মামলায় ৪২ হাজার টাকা এবং রায়পুরে তিন মামলায় ১১ হাজার টাকা অর্থদন্ড আদায় করা হয়েছে। জনস্বার্থে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রুখতে জেলা প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি ও অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।