
দীর্ঘ ১৫ বছর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে ভারতীয় জনতা পার্টি – বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তার হিন্দুত্ববাদের ঝান্ডা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। বিজেপি শুধু জিতেই-নি, তৃণমূল কংগ্রেস ও তার নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে হারিয়েছে বড় ব্যবধানে। এতো বড় বিজয় হবে বিজেপি তা হয়তো নিজেও ভাবেনি।
বিতর্কিত ভোটার তালিকায় বড় বিজয়-এমন শিরোনাম করছে অনেক সংবাদমাধ্যম। কারণ এই বিধানসভা নির্বাচনের আগে চলতি মাসে নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় সংশোধন- এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার হালনাগাদ করেছে। এটি একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়া,যা নিয়ে বিহার,আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। বলা হয় এর লক্ষ্য ছিল মুসলিম ভোটারদের ভোট দিতে না দেওয়া।
এর ফলে-৯২ লাখের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে 'অনুপস্থিত' বা 'মৃত' ঘোষণা করা হয়। বাকি ৩০ লাখ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে যেতে পেরেছেন,কিন্তু শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ভোট দিতে পারেন নি। যেসব জেলায় মুসলিম বেশি এবং যাঁরা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারেন,সেখানেই নাম কাটার হার বেশি ছিল।
এটিই ছিল বড় ফ্যাক্টর। অন্যসব ব্যাপার তো ছিলই। দীর্ঘদিনের শাসন,তাই পরিবর্তন চাচ্ছিল মানুষ, ছিল মমতার বিরুদ্ধের ব্যাপক দুর্নীতি,সন্ত্রাস এবং দুর্বিনীত আচরণের অভিযোগ।
মমমতার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ভিত্তি ছিল ৩৪ শতাংশ মুসলিম ভোট। তাই এবার বিজেপির জয়ে জোরালোভাবে সামনে আসছে এই আলোচনা যে, সেখানকার মুসলিমদের ভাগ্যে কী হবে?
এসআইআর-এর মাধ্যমে এমন সব মুসলিম ভোটারদের বাদ দেওয়া হয়েছে যারা ভারতে হয়ে ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ,কার্গিল যুদ্ধ এমনকি সর্বশেষ অপারেশন সিন্দুরেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করে মেডেল পেয়েছেন। এমনসব মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে যারা কয়েকশ বছর বংশ পরম্পরায় সেখানে বাস করছেন।
বলা হচ্ছে যে,মুসলিমদের আসলে পরিকল্পিতভাবে তালিকা থেকে বাদ দিতে এই কাজ করা হয়েছে। তাই এখন বড় চিন্তার বিষয়–পশ্চিবঙ্গের মুসলমানদের কী হবে?
নাগরিকত্ব,বৈধ কাগজপত্র এবং বসবাসের অধিকার এসব বিষয় সামনে আসতে পারে আরও গুরুত্বসহকারে। যদি নতুন সরকার কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করে,তাহলে অনথিভুক্ত বা সন্দেহভাজন অভিবাসীদের ওপর নজরদারি বাড়তে পারে,এমনকি আইনি জটিলতা বা প্রত্যাবাসনের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এবং এসব নীতির একমাত্র টার্গেট হবে মুসলিমরা।
সেক্যুলার পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্বাদের উত্থানে বাংলাদেশেও চলছে ব্যাপক বিচার বিশ্লেষণ। অদ্ভুতভাবে বাংলাদেশে যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে তারা পশ্চিমবঙ্গে আরেকটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিজয় নিয়ে সমালোচনা করেছে। আবার বাংলাদেশে যারা সেক্যুলার রাজনীতি চায় তারা তৃণমূলের পরাজয়ে ব্যথিত। এ এক বড় বৈপরীত্যে।
বিজেপির এই জয় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত হতে দেননি। বারবার এই প্রশ্নে তিনি কেন্দ্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। কিন্তু বিজেপি শাসিত পশ্চিমবঙ্গ মানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সেই টানাপড়েন আর থাকবে না। ফলে তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নে দিল্লির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথ যেমন সহজ হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। তবে বিষয়টি এত সহজও নয় নানা কারণে। কালন তখন ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস, এখন বিজেপি, যাদের রাজ্য নেতারা ভয়ংকর বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে এগিয়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারী পরিচিত একজন কঠোর হিন্দুত্ববাদী মুখ হিসেবে। নন্দিগ্রামে মমতাকে পরাজিত করে তিনি যে রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করেছেন,তাতে বাংলাদেশ বিষয়ক তার অবস্থান কখনোই নমনীয় ছিল না।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর। বিজেপির রাজনীতির কেন্দ্রে হিন্দুত্বের যে আদর্শ,তা পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে ঘিরে নানা রাজনৈতিক বয়ান আরও সোচ্চার হবে। এই বয়ানগুলো অনেক সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে চাপে ফেলে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানসে ভারত-বিরোধী অনুভূতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অর্থনৈতিক বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের পরিমাণ বিশাল। পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে যে বাণিজ্য প্রবাহ,তা দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বিজেপি সরকার যদি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি আরোপ করে,তাহলে এই বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভাটা পড়তে পারে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। ঢাকার আলোচনা হবে দিল্লির সঙ্গে। তবে একথাও ঠিক পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া পতাকা ওড়ার মানে শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতা পরিবর্তন নয় এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার সূচনা। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখনই সতর্ক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে। আবেগের রাজনীতি নয়,বরং বাস্তববাদী কূটনীতিই হোক আমাদের পথচলার ভিত্তি। কারণ প্রতিবেশী বদলানো যায় না,কিন্তু সম্পর্কের ভাষা বদলানো যায় এবং সেই ভাষাটি আমাদেরই বেছে নিতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : উজ্ব্বল হোসাইন
ভিজিট : www.dailyruposhibangla.com